tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকজনসমক্ষে নেই মোজতবা খামেনি, শারীরিক অবস্থা নিয়ে যা জানালেন ইরানি কূটনীতিক

জনসমক্ষে নেই মোজতবা খামেনি, শারীরিক অবস্থা নিয়ে যা জানালেন ইরানি কূটনীতিক

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সুস্থ রয়েছেন এবং নিয়মিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন বলে দাবি করেছেন দেশটির জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আবদুল মজিদ হাকিম ইলাহি। নিরাপত্তার কারণেই মোজতবা জনসমক্ষে আসছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সর্বোচ্চ নেতার সাত ঘণ্টার বৈঠক হয়েছে বলেও দাবি করেছেন এই কূটনীতিক।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানান ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ইলাহি।

প্রায় আট মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ওই হামলায় তাঁর বাবা ও ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। বাবার মৃত্যুর পর মোজতবা সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তিনি মূলত লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন, সরাসরি জনসমক্ষে আসেননি।

গত জুলাইয়ে বাবার শেষকৃত্যেও তাঁকে দেখা না যাওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থা ও নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়।

‘সুস্থ আছেন, নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন’

এনডিটিভিকে ইলাহি বলেন, মোজতবা খামেনি শারীরিকভাবে ভালো আছেন এবং স্বাভাবিকভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর দাবি, গত সপ্তাহেই ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাত ঘণ্টা ধরে বৈঠক করেছেন সর্বোচ্চ নেতা।

ইলাহি আরও জানান, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকারও মোজতবার সঙ্গে দীর্ঘ সময় বৈঠকের কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া সর্বোচ্চ নেতার পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাঁর সুস্থতার বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন বলে দাবি করেন এই কূটনীতিক।

মোজতবা বাবার শেষকৃত্যে উপস্থিত ছিলেন না—এমন বক্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেন ইলাহি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় তিনি ইরানেই ছিলেন এবং মোজতবার দুই ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। মোজতবাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।

ইলাহির আরও বক্তব্য, কখনো কখনো মোজতবা রাতে রাস্তায় বের হন এবং ইরানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ-সমাবেশেও অংশ নিয়েছেন। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

আড়ালে থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনার দাবি

ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ সূত্রের দাবি, মোজতবা খামেনি এখনো রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে তিনি প্রকাশ্যে না এসে আড়াল থেকেই দায়িত্ব পালন করছেন।

কয়েকটি সূত্রের দাবি, হামলায় তাঁর মুখমণ্ডল গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সুস্থ হয়ে ওঠার সময় দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজের বড় অংশ তিনি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ওপর ছেড়ে দেন বলেও জানা গেছে।

ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোজতবা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবেদন পাচ্ছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

বাবার জীবদ্দশাতেও মোজতবা পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন বলে জানা যায়। প্রকাশ্যে উপস্থিত হওয়ার প্রবণতা তাঁর বরাবরই কম ছিল।

গত ২১ জুলাই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছিলেন, সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ ক্রমেই বাড়ছে। তবে আগস্টের শুরুতে তিনি বলেন, মোজতবার সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে সামরিক পরিস্থিতি ও অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল সম্পদ সুরক্ষা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, জ্বালানির ব্যবহার এবং বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক।

এর আগে মে মাসে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, পেজেশকিয়ান মোজতবার সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা বৈঠক করেছেন। সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁদের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম প্রকাশ্যে আসা বৈঠকের খবর।

ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে সংশয় যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলতি মাসের শুরুতে তিনি মন্তব্য করেন, ইরানের যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে আসলে কে রয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্পের দাবি, ইরানের প্রথম সারির নেতাদের পাশাপাশি দ্বিতীয় সারির নেতারাও নিহত হয়েছেন। তাঁর উদ্বেগ, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটি কে পরিচালনা করছেন, তা পরিষ্কারভাবে জানা যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ওয়াশিংটনের আলোচনা চলছে। তবে ইরানের ক্ষমতাকাঠামোয় তাঁদের প্রকৃত কর্তৃত্ব কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ভ্যান্সের মতে, ইরানে কীভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দেশটির একজন মুখপাত্রের দাবি, ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা ইরানের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের পরিচয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের নেতৃত্ব, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে মোজতবা খামেনির দীর্ঘদিন জনসমক্ষে অনুপস্থিতি এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে ইরানি কূটনীতিকের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি সুস্থ আছেন এবং আড়ালে থেকেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন।