সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দখল, হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে আসায় দলটির হাইকমান্ড ও সরকার চাপের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি অভিযোগের প্রমাণ মিললে আইনগত ব্যবস্থার বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, মহানগর উত্তর যুবদল ও মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসেছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে অস্বস্তিতে পড়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। দখল, চাঁদাবাজি, হামলা ও ভাঙচুরের মতো অভিযোগে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারও সমালোচনার মুখে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হচ্ছে—রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কোনো অনিয়ম বা অপরাধে জড়িত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সাংগঠনিক শাস্তির পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে রাজধানীর তিন গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিটের কমিটি বিলুপ্ত এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকর্মীকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত সেই কঠোর অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রথম আলো জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বুধবার রাতে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। পরদিন বৃহস্পতিবার তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গত ২৫ সেপ্টেম্বর মুখোশধারী দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে লুটপাট ও ভাঙচুর করে স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেয় বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও জানিয়েছেন, নিরপেক্ষ তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে ছাড় দেওয়া হবে না।
তদন্তে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছে। প্রথম আলোর অনুসন্ধান অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়া এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশার নামও এসেছে। তাঁরা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
রাড্ডার ঘটনার পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে দখল ও ভাঙচুরের অভিযোগ সামনে আসায় বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, উত্তর যুবদল এবং পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি একসঙ্গে বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তে দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক জবাবদিহির বিষয়টি সামনে এসেছে।
বিএনপির নেতাদের বক্তব্য, কমিটি বিলুপ্ত করা কিংবা বহিষ্কার সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার অংশ। তবে দলের কয়েকজন তৃণমূল ও শীর্ষ নেতা মনে করছেন, শুধু কমিটি ভেঙে দিলেই দখল, চাঁদাবাজি বা অনিয়ম বন্ধ হবে না। কেন্দ্রীয়ভাবে সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং মাঠপর্যায়ে যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে ওয়ার্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন তারা।
দলের একজন সিনিয়র নেতার ভাষ্য, দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগের রাজনীতি থেকে বিএনপি বেরিয়ে আসতে চায়। রাজধানীতে একসঙ্গে তিনটি কমিটি বিলুপ্ত করা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়ে তৃণমূলে সেই বার্তাই দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি ও সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, আইন সবার জন্য সমান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি দলের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্তের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের লক্ষ্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মুনির হোসেন কমিটি বিলুপ্তির বিষয়টিকে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেছেন, সরকার ও দলের অবস্থান স্পষ্ট—কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত হওয়া যাবে না এবং সরকার বা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খানও ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনাকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বক্তব্য, সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন কর্মকাণ্ডে কেউ জড়ালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বিএনপির জন্য এখন বড় বিষয় শুধু তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক শাস্তি নয়; এসব সিদ্ধান্ত কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে একই নীতিতে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, নতুন কমিটিগুলোতে বিতর্কিত ব্যক্তিরা আবার জায়গা পাবেন কি না—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন মত থাকলেও সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোতে বিএনপি যে তৃণমূলের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আগের তুলনায় কঠোর বার্তা দিচ্ছে, তা স্পষ্ট। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় সংসদ সদস্যের পদত্যাগ, তিন সাংগঠনিক ইউনিটের কমিটি বিলুপ্তি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত সেই অবস্থানকেই সামনে এনেছে। এখন এসব সিদ্ধান্তের পরবর্তী বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা কতটা কার্যকরভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।



