ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালা সংস্কারের নামে মুক্তিসংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আড়াল এবং পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি অন্তর্ভুক্তির অভিযোগে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।
মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন এ প্রতিবাদ জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, ডাকসু সংগ্রহশালা সংস্কারের নামে মুক্তিসংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আড়াল করার চেষ্টা এবং মাতৃভাষার অধিকারবিরোধী অবস্থানের জন্য সমালোচিত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি সেখানে অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনায় উদীচী গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে।
উদীচীর নেতারা বলেন, একটি জাতির ইতিহাস কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা নির্দিষ্ট সময়ের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় নয়। দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও অর্জনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ইতিহাস জাতির প্রামাণ্য ঐতিহ্য। তাই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাদ দেওয়া বা তার উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনা শুধু সংস্কার কার্যক্রমের বিষয় নয়; এর ফলে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটতে পারে।
বিবৃতিতে তারা আরও বলেন, বাঙালির স্বাধিকার ও মুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুর ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ষাটের দশকের শিক্ষা আন্দোলন ও স্বাধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ডাকসু ভবন প্রাঙ্গণে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। একই বছরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের অনেকে শহীদ হন। উদীচীর মতে, এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার কোনোভাবেই উপেক্ষা করা উচিত নয়।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি সংগ্রহশালায় স্থান দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলে উদীচী। সংগঠনটির নেতারা বলেন, ১৯৪৮ সালে ঢাকার কার্জন হলে জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ছবি ডাকসু সংগ্রহশালায় স্থান দেওয়ার পাশাপাশি ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ দলিল-স্মারক বাদ দেওয়া হলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বিবৃতিতে উদীচী ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি অপসারণ এবং ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত গণসংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাস যথাযথভাবে উপস্থাপনের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের আত্মত্যাগের স্মারক ও দলিল সংগ্রহশালায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে যারা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, একটি জাতির ইতিহাস থেকে তার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের অধ্যায় বাদ দেওয়ার চেষ্টা জাতির ঐতিহাসিক আত্মপরিচয়কে দুর্বল করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুর মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহ্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার। তাই ইতিহাসের যথাযথ সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের দাবিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতি সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।



