ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালাকে নতুনভাবে সাজিয়ে উদ্বোধন করা হয়েছে। দেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ডাকসুর দীর্ঘ পথচলার নানা স্মৃতি ও নিদর্শন সংরক্ষণের লক্ষ্যেই সংস্কারের পর সংগ্রহশালাটিকে আরও আধুনিক ও তথ্যসমৃদ্ধ করা হয়েছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সংস্কার করা সংগ্রহশালার উদ্বোধন করেন ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম। পুরো সংস্কার কার্যক্রমের তত্ত্বাবধানে ছিলেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা।
উদ্বোধনী আয়োজনে ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এইচ এম মোশারফ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম, ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদসহ বিভিন্ন সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ডাকসুর সাবেক ভিপি বদরুল আলমের মেয়ে ফারজানা আলম ও তার পরিবারের সদস্যরাও অংশ নেন। পাশাপাশি ডাকসু ও হল সংসদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
ছড়িয়ে থাকা ইতিহাস এক জায়গায় আনার উদ্যোগ
সংগ্রহশালার সংস্কার প্রসঙ্গে ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের ইতিহাসের সঙ্গে ডাকসুর কার্যক্রম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সংগঠনটির দীর্ঘ ভূমিকার বহু স্মৃতি বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে।
দীর্ঘদিন সংগ্রহশালাটি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই সংস্কার শেষে সংগ্রহশালাটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
তিনি জানান, আগামী এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে এখানে আরও ঐতিহাসিক নথি ও উপকরণ যুক্ত করা হবে। সাবেক ডাকসু নেতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে থাকা পুরোনো ছবি, নথিপত্র, পোস্টার, প্রকাশনা ও স্মারক সংগ্রহ করে ধাপে ধাপে প্রদর্শনীতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তার আশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সংগ্রহশালাটি ভবিষ্যতে ডাকসুর একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক আর্কাইভে পরিণত হবে।
রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত ইতিহাসের দাবি
ডাকসুর ১৯৫৭-৫৮ সেশনের ভিপি বদরুল আলমের মেয়ে ফারজানা আলম বলেন, ১৯৫৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস ও তথ্য সংগ্রহশালায় ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
তার মতে, এ উদ্যোগের ফলে নতুন প্রজন্ম ডাকসুর সাবেক নেতাদের কার্যক্রম, তাদের সময়ের নানা প্রতিকূলতা এবং অর্জন সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।
ফারজানা আলম বলেন, অতীতের ছাত্র প্রতিনিধিরা বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে থেকে ছাত্রসমাজের স্বার্থের কথা তুলে ধরেছেন। কোনো নির্দিষ্ট দল বা মতকে প্রাধান্য না দিয়ে ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়ায় ডাকসুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ থেকে জুলাই আন্দোলন—স্থান পেয়েছে নানা অধ্যায়
ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ জানান, ১৯৯০ সালের পর দীর্ঘ সময় অবহেলায় থাকা সংগ্রহশালাটি সংস্কার করে নতুনভাবে চালু করা হয়েছে। এখানে দেশের প্রাচীন ইতিহাসের পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সময়ক্রম অনুযায়ী তুলে ধরা হয়েছে।
তবে সংগ্রহশালায় এখনো কয়েকজন সাবেক ভিপির ছবি এবং কিছু তথ্যের ঘাটতি রয়েছে বলে জানান তিনি। আগামী এক সপ্তাহ এসব তথ্য সংশোধন ও সংযোজনের জন্য রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ছবি, তথ্য বা সংশোধনী কারও কাছে থাকলে তা ডাকসুর কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
৩৯টি ডাকসুর ইতিহাসও প্রদর্শনীতে
উদ্বোধনী বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, সংস্কার করা সংগ্রহশালায় ১৯০৫ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় স্থান পেয়েছে।
ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের দলিল, আলোকচিত্র ও শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন সেখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সাদিক কায়েম আরও বলেন, ১৯২১ সাল থেকে অনুষ্ঠিত ৩৯টি ডাকসুর ইতিহাস এবং সাবেক ভিপি ও জিএসদের নামসংবলিত সম্মাননা ফলকও সংগ্রহশালায় যুক্ত করা হয়েছে।
সংগ্রহশালাকে আরও সমৃদ্ধ করতে দেশবাসী ও গবেষকদের কাছে থাকা পুরোনো ঐতিহাসিক নথি এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের দুর্লভ ছবি ডাকসুর কাছে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নতুন করে সাজানো এই সংগ্রহশালার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও সহজে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।



