জ্বালানির বাড়তি দামের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পাইকারি থেকে খুচরা—সব পর্যায়েই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। চাল, ডাল, তেল, মাংস ও সবজিসহ প্রায় সব পণ্যের দামই ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজারে গিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন ক্রেতারা।
এদিকে জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে দূরপাল্লার ট্রাক ভাড়াও। অনেক ক্ষেত্রে প্রতি ট্রিপে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে, কোথাও কোথাও তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে, কমছে ট্রিপের সংখ্যা—যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামে।
সরজমিনে দেখা গেছে, ডিজেলনির্ভর পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে নতুন করে দাম বাড়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে চাল, চিনি, ডিম ও পিয়াজসহ বেশ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে।
রাজধানীর কাওরান বাজারে প্রতিদিন কয়েকশ’ ট্রাক পণ্য নিয়ে এলেও জ্বালানির দাম বাড়ার পর থেকে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগে যে ভাড়া ছিল ১৭-১৮ হাজার টাকা, এখন তা অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
এর প্রভাবে মোকাম থেকে আলু, পটোল, টমেটো বা কাঁচামরিচ আনতে কেজিপ্রতি ১ থেকে ৫ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। পাশাপাশি ট্রাক সংকটের কারণে অনেক পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারছে না, এমনকি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
চালের বাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট। মাঝারি চাল (বিআর-২৮, পায়জাম) কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়েছে। মোটা চাল (স্বর্ণা, চায়না ইরি) ও সরু চাল (মিনিকেট) কেজিতে ১-২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বিআর-২৮ চাল, যা গত সপ্তাহে ৫৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, এখন তা ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরু চাল মানভেদে ৭০ থেকে ৮৫ টাকা এবং মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চালের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে নতুন আমনের চাল আছে, পাশাপাশি ভারত থেকেও আমদানি চলছে এবং বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে—এ অবস্থায় দাম বাড়ার কথা ছিল না। কিন্তু পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি কেজিতে ১-২ টাকা বাড়তি পড়ছে।
চিনির দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে এখন ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ১০০ থেকে ১০৫ টাকা। পিয়াজের দামও বেড়ে ৩৫-৪৫ টাকায় উঠেছে, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৩০-৩৫ টাকা।
তবে কিছুটা স্বস্তি এসেছে মুরগির বাজারে। ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম কমেছে। সোনালি মুরগি এখন ৩৫০-৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৪০০ টাকার বেশি। ব্রয়লার মুরগিও ১৭০-১৮০ টাকায় নেমে এসেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় দাম কমেছে এবং সামনে আরও কমতে পারে।
সবজির বাজারেও কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। করলা, পটোল ৫০-৬০ টাকা, ঢেঁড়স ৪০-৫০ টাকা, বেগুন ৬০-৮০ টাকা এবং আলু ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে অনেক সবজির দাম ২০-৩০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।
অন্যদিকে মাছের বাজারে উল্টো চিত্র। প্রায় সব ধরনের মাছের দাম কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেড়েছে। পাঙ্গাশ ২৩০ টাকা, রুই ৩৪০-৩৭০ টাকা এবং বড় আকারের রুই ৪২০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। রান্না, কৃষি, পরিবহন ও উৎপাদন—সবখানেই এর প্রভাব দৃশ্যমান। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে—ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯.১৩ শতাংশ এবং মার্চে ৮.৭১ শতাংশ। এই প্রেক্ষাপটে বাজারদর বাড়া মানেই সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি ভোগান্তি।



