tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশজেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ, বাজারে সরবরাহ বাড়লেও কমেনি দাম

জেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ, বাজারে সরবরাহ বাড়লেও কমেনি দাম

  1. সাগর ও মেঘনা নদীতে জেলেদের জালে এখন ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ছে রূপালি ইলিশ। কাঙ্ক্ষিত মাছ ধরা পড়ায় উপকূলীয় এলাকার জেলে, আড়তদার ও মৎস্যজীবীদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি। তবে সরবরাহ বাড়লেও এর প্রভাব এখনো খুচরা বাজারে পড়েনি। ফলে রায়পুরসহ আশপাশের বাজারে ইলিশের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।

    বৃহস্পতিবার বিকেলে রায়পুর, সদর ও চরভৈরবি এলাকার বিভিন্ন মাছের আড়ত ও বাজার ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। বিক্রেতাদের ভাষ্য, বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা বেশি থাকায় দাম কমতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।

    জেলেদের জালে ফিরেছে স্বস্তি

    জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ায় লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর ঘাট, রায়পুরের উত্তর ও দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের বিভিন্ন জেলেপল্লি এবং আড়তগুলোতে এখন ব্যস্ততা বেড়েছে। গত এক মাস মেঘনা নদীর নাব্যতার কারণে ট্রলার ও নৌকা নিয়ে সাগরে গেলেও শুরুতে আশানুরূপ ইলিশ পাচ্ছিলেন না জেলেরা। তবে গত কয়েক দিনে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে।

    ইলিশের মোকাম হিসেবে পরিচিত মজুচৌধুরীঘাট, মতিরহাট, রায়পুর ও সীমান্তবর্তী চরভৈরবির আড়তগুলোতেও এখন জমজমাট বেচাকেনা চলছে। রায়পুরের সীমান্তবর্তী চরভৈরবি, হাইমচরসহ বিভিন্ন বাজারে ইলিশ কেনাবেচায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা।

    কেন বাড়ছে ইলিশের পরিমাণ?

    ইলিশ বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছর বেশি বৃষ্টিপাতের কারণে নদীতে পানির প্রবাহ বেড়েছে। পাশাপাশি সামুদ্রিক নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবেও ইলিশের বিচরণ ও উৎপাদন বেড়েছে। নদীর পানির গুণাগুণ ও প্রবাহ ইলিশের জন্য অনুকূল থাকায় সাগর থেকে ডিমওয়ালা মা ইলিশ স্রোতযুক্ত মিঠাপানির নদীতে আসছে।

    এ ছাড়া ইলিশের প্রজনন ও জাটকা সংরক্ষণে কয়েক বছর ধরে নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করায় ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

    সাধারণত জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে সমুদ্র থেকে নদীতে ইলিশের বিচরণ বাড়তে থাকে। পদ্মা ও মেঘনা নদীর পানির গভীরতা ও প্রবাহ ইলিশের জন্য উপযোগী হওয়ায় এ অঞ্চলে এ সময় তুলনামূলক বেশি ইলিশ ধরা পড়ে।

    আড়তে ইলিশের ছড়াছড়ি

    রায়পুর, রামগতি, কমলনগর, মজুচৌধুরীঘাট ও সীমান্তবর্তী চরভৈরবির আড়তগুলোতে এখন ট্রলার থেকে ইলিশ নামাতে ব্যস্ত শ্রমিকরা। ঝুড়ি ভর্তি মাছ নিয়ে আড়তে ছুটছেন তারা। কোথাও চলছে মাছের ওজন, কোথাও চলছে দরদাম।

    আড়ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসব ইলিশ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে পাঠাচ্ছেন। ফলে জেলার বিভিন্ন মাছের আড়তেই এখন ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে।

    আকারভেদে ভিন্ন ইলিশের দাম

    ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ইলিশের দাম মূলত মাছের আকার ও ওজনের ওপর নির্ভর করে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ চার উপজেলার বাজারে ২০০ গ্রাম ওজনের প্রায় পাঁচটি ইলিশ মিলছে ৩৫০ টাকা কেজি দরে। অন্যদিকে এক কেজি বা তার বেশি ওজনের একটি ইলিশ কিনতে খরচ হচ্ছে কমপক্ষে ১ হাজার ২০০ টাকা।

    আড়তে প্রতি কেজি বড় ইলিশ সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে এসে সেই দাম বেড়ে দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা। স্থানভেদে দাম আরও বেশি হতে পারে।

    রায়পুরের হাজিমারা স্লুইসগেট এলাকার ইলিশ আড়তদার দেলোয়ার হোসেন বলেন, এবারের ইলিশের আকার তুলনামূলক বড়। ছোট মাছও পাওয়া যাচ্ছে, তবে পরিমাণে কম। সামনে ইলিশের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি। তার মতে, এখন ইলিশের মূল মৌসুম হওয়ায় আগামী দিনে দামও কিছুটা কমতে পারে।

    সাজু মোল্লারঘাটের আড়তদার শাহ আলম বলেন, বাজারে মাঝারি আকারের ইলিশের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের বড় একটি অংশ এই আকারের মাছ কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বড় ইলিশের চাহিদা থাকলেও বেশি দামের কারণে তা সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই।

    খুশি জেলেরা, কমার আশা দামের

    নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগর ও নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে শুরুতে আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ায় হতাশ ছিলেন জেলেরা। তবে বর্তমানে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ায় তাদের মুখে হাসি ফুটেছে। মাছের আকারও তুলনামূলক বড় হওয়ায় তারা ভালো দামের প্রত্যাশা করছেন।

    জেলেরা জানান, অন্যান্য বছর বড় আকারের ইলিশের জন্য আড়তে রপ্তানিকারকদের আনাগোনা দেখা গেলেও এবার এখনো তেমন কোনো ক্রেতা আসেননি।

    লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ায় জেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। বাজারেও তাই সরবরাহ বেড়েছে এবং মাছের আকারও বেশ বড়। বর্তমানে দাম কিছুটা বেশি থাকলেও সামনে ইলিশের সরবরাহ আরও বাড়লে দাম কমতে পারে।

    হায়দরগঞ্জ বাজারের মাছ ব্যবসায়ী ইউসুফ হোসেন বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়ছে। আড়তেও প্রচুর মাছের বেচাকেনা হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে জেলেরা এবার ভালো লাভ করতে পারবেন।

    উৎপাদন ৬ লাখ টন ছাড়ানোর আশা

    মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, মা ইলিশ রক্ষা, জাটকা সংরক্ষণ এবং জেলেদের ভিজিএফ ও পুনর্বাসনের মতো কার্যক্রমের পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় দেশে ইলিশ উৎপাদন বাড়ছে।

    চলতি বছর দেশে প্রায় ৬ লাখ টন ইলিশ উৎপাদনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইলিশের অবদান প্রায় এক শতাংশ।