tanaka
প্রচ্ছদইসলাম ও জীবনজলবায়ু পরিবর্তন ও কিয়ামতের আলামত

জলবায়ু পরিবর্তন ও কিয়ামতের আলামত

মহাবিশ্বের সবকিছু মহান আল্লাহর সৃষ্টি—এ বিশ্বাস ইসলামের মৌলিক আকিদার অংশ। আসমান-জমিন, চন্দ্র-সূর্য, আলো-বাতাস, সাগর-মহাসাগর, পাহাড়-পর্বত, বনভূমি, জীবজন্তু ও মানুষ—সবই তাঁর সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে এই বিশ্বব্যবস্থার অবসান ঘটবে এবং সংঘটিত হবে কিয়ামত।

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে কিয়ামতের বিভিন্ন আলামত ও সেই দিনের ভয়াবহতার বর্ণনা রয়েছে। একজন মুমিনের কাছে কিয়ামতের সংঘটন একটি অবিচল বিশ্বাস। তবে পৃথিবীতে পরিবেশগত পরিবর্তন, জলবায়ু সংকট ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণা নতুন করে মানুষকে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবাচ্ছে।

পরিবেশের ভারসাম্য ও মানুষের জীবন

মানুষের জীবনধারণের জন্য সুস্থ পরিবেশ অপরিহার্য। খাদ্য, পানি, বাসস্থান ও স্বাস্থ্য—প্রায় প্রতিটি মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে পরিবেশের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে মানুষের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রও নানা সংকটে পড়ে।

প্রাকৃতিক পরিবেশ কোনো স্থির ব্যবস্থা নয়; এটি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল একটি প্রক্রিয়া। আলো, বাতাস, পানি, মাটি, বন, পাহাড়, নদী, সাগর ও জীবজগতের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এই পরিবেশ গড়ে উঠেছে।

ইসলামী দৃষ্টিতে পরিবেশ আল্লাহর দেওয়া একটি নেয়ামত। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি প্রত্যেক বস্তুকে সুষমভাবে ও পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা আল-কামার: ৪৯)

এই ভারসাম্য রক্ষা করা মানুষের দায়িত্বেরও অংশ। অথচ মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবেশের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বড় কারণ মানবসৃষ্ট দূষণ

পরিবেশ দূষণের কিছু কারণ প্রাকৃতিক হলেও আধুনিক সময়ে মানবসৃষ্ট দূষণ বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। পারমাণবিক ও রাসায়নিক বর্জ্য, শিল্পকারখানার দূষণ, যানবাহনের ধোঁয়া, বন উজাড়, নদী-নালা দখল ও দূষণ, প্লাস্টিক ও পলিথিনের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং বন্যপ্রাণী নিধনের মতো কর্মকাণ্ড পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।

গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে হিমবাহ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, আবহাওয়ার ধরন এবং বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের ওপর।

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভবিষ্যতে আরও তীব্র হতে পারে। হিমবাহ গলে যাওয়া, আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস, তাপপ্রবাহ ও চরম আবহাওয়ার বিভিন্ন ঘটনা সেই ঝুঁকির দিকেই ইঙ্গিত করছে।

হিমালয়ের পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ

হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ ও পারমাফ্রস্টের পরিবর্তনও বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের কারণ। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে দীর্ঘদিন ধরে বরফে জমাট থাকা শিলা, মাটি ও অন্যান্য স্তরের স্থিতিশীলতা দুর্বল হতে পারে। এতে পাহাড়ের ঢালে পানি প্রবেশের সুযোগ বাড়ে এবং কিছু ক্ষেত্রে ভূমিধসের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

হিমবাহের সংকোচনও এ অঞ্চলের পরিবেশগত পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। হিমবাহের বরফ গলনের সঙ্গে পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতা, পানিপ্রবাহ ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকির মতো বিষয়গুলোও সম্পর্কিত।

এসব পরিবর্তন শুধু পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য নয়, এর প্রভাব নদী, কৃষি, পানিসম্পদ ও জনজীবনের ওপরও পড়তে পারে।

কোরআনে কিয়ামতের বর্ণনা

ইসলামী বিশ্বাসে কিয়ামত একটি নিশ্চিত বাস্তবতা। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ পরিবর্তনের বর্ণনা এসেছে।

সূরা আত-তাকভীরে বলা হয়েছে—

‘সূর্য যখন আলোহীন হয়ে পড়বে,
তারকারা যখন খসে পড়বে,
পাহাড়সমূহ যখন চলতে শুরু করবে,
আর বন্য পশুগুলো যখন একত্রিত করা হবে,
আর সাগর যখন উত্তাল হয়ে উঠবে।’

অন্যদিকে সূরা আল-ইনফিতারের শুরুতে বলা হয়েছে—

‘আকাশ যখন বিদীর্ণ হবে,
তারকারা যখন বিক্ষিপ্তভাবে ঝরে পড়বে,
আর সাগরসমূহ যখন বিস্ফোরিত হবে।’

কোরআনের এসব বর্ণনা ইসলামী বিশ্বাসের দৃষ্টিতে কিয়ামতের সময় মহাবিশ্বে সংঘটিত ব্যাপক পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে। তবে এসব আয়াতকে আধুনিক জলবায়ু পরিবর্তনের নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখার ক্ষেত্রে ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার পার্থক্য মনে রাখা জরুরি।

পরিবেশ রক্ষায় ইসলামের শিক্ষা

ইসলামে প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গাছ লাগানো এবং মানুষের পাশাপাশি প্রাণী ও পাখির উপকারে আসে—এমন কাজকে সওয়াবের সঙ্গে যুক্ত করে হাদিসে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

একটি হাদিসে এসেছে, কোনো মুসলমান গাছ রোপণ করলে এবং তা থেকে মানুষ, পাখি কিংবা কোনো প্রাণী উপকৃত হলে সেটি তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়। (বুখারি, মুসলিম)

পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও ইসলামে বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।’

পবিত্র কোরআনেও পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। সূরা আত-তাওবাহতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সূরা আত-তাওবাহ: ১০৮)

গাছ লাগানো ও পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি পানি, মাটি, বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার আধুনিক উদ্যোগগুলোকেও পরিবেশ সংরক্ষণের বৃহত্তর দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

কিয়ামত ও জলবায়ু পরিবর্তন—দুটি বিষয় কি এক?

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর সামনে বড় ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে—এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে সুস্পষ্ট বিশ্বাস রয়েছে।

তবে জলবায়ু পরিবর্তনকে কিয়ামতের সরাসরি কারণ বা কোরআন-হাদিসে বর্ণিত নির্দিষ্ট আলামত হিসেবে চিহ্নিত করা ধর্মীয় ব্যাখ্যার একটি বিষয়; এটিকে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। বৈজ্ঞানিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর পরিবেশ ও মানবসমাজের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে—কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বিজ্ঞান কিয়ামতের সময় বা সংঘটন সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেছে।

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী কিয়ামত অবশ্যই সংঘটিত হবে। আর মানবিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবেশ রক্ষা, দূষণ কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা করাও মানুষের দায়িত্ব।

পরিবেশ রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি

জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একক দেশ বা জনগোষ্ঠীর সমস্যা নয়। এর প্রভাব বৈশ্বিক। তাই পরিবেশ দূষণ কমাতে উন্নত ও উন্নয়নশীল—সব দেশেরই দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

শিল্প ও জ্বালানি খাতে দূষণ কমানো, বন সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, নদী ও জলাভূমি রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন—এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা সম্ভব।

ইসলামের শিক্ষা এবং আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানের বাস্তব অভিজ্ঞতা—দুই দিক থেকেই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্ব স্পষ্ট। মানুষ হয়তো কিয়ামতের সময় নির্ধারণ করতে পারে না, কিন্তু নিজের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পৃথিবীর পরিবেশকে আরও বাসযোগ্য কিংবা আরও বিপন্ন করে তুলতে পারে।

তাই কিয়ামতের বিশ্বাস একজন মুসলমানের ঈমানের অংশ হলেও, পৃথিবী ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব বর্তমান মানুষেরই। প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, অপচয় ও দূষণ কমানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করার চেষ্টা মানবিক ও নৈতিক—উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।