tanaka

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা

দেশের বাজারে আবারও কমেছে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ১ হাজার ৬৯১ টাকা কমিয়ে ২ লাখ...
প্রচ্ছদসারাদেশজঙ্গল সলিমপুরে চিরুনি অভিযান, অধরাই মূল হোতারা

জঙ্গল সলিমপুরে চিরুনি অভিযান, অধরাই মূল হোতারা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর বিশেষ চিরুনি অভিযানে মূল হোতারা এখনও ধরা পড়েনি। ধারণা করা হচ্ছে, তারা গোপন সুড়ঙ্গপথ ব্যবহার করে পালিয়ে গেছে।

সোমবার (৯ মার্চ) ভোর ৬টা থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান বিকেল পর্যন্ত চলে। ভোরেই জঙ্গল সলিমপুর এলাকার চারদিক ঘিরে ফেলে যৌথবাহিনী। হঠাৎ এমন তৎপরতায় স্থানীয় বাসিন্দারা হতভম্ব হয়ে পড়েন।

প্রশাসনিকভাবে জঙ্গল সলিমপুর সীতাকুণ্ড উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও সেখানে প্রবেশ করতে হয় চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে। বায়েজিদ লিংক রোড ধরে ভাটিয়ারি যাওয়ার পথে ডান দিকে জঙ্গল সলিমপুর। অভিযানের সময় এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার সব পথে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়, যাতে কেউ পালিয়ে যেতে না পারে।

যৌথবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালান। অতীতে এ এলাকায় অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ায় এবার ভিন্ন কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। এ সময় অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খান সরেজমিনে উপস্থিত থেকে অভিযান তদারকি করেন। এছাড়া সাতজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) রাসেল জানান, অভিযানে প্রায় চার হাজার সদস্য অংশ নেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৮৭ জন, জেলা পুলিশের ১৪৬ জন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ৮০০ জন, আরআরএফ চট্টগ্রামের ৪০০ জন, ফেনী জেলা পুলিশের ১০০ জন, পার্বত্য জেলার ৩০০ জন, এপিবিএনের ৩৩০ জন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ১২২ জন এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের ৩৭১ জন সদস্য ছিলেন। মোট ৩ হাজার ১৮৩ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অভিযানে অংশ নেন।

অভিযানকে কার্যকর করতে তিনটি হেলিকপ্টার, ১৫টি সাঁজোয়া যান (এপিসি), র‍্যাব ও সিএমপির তিনটি ডগ স্কোয়াড এবং ১২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়।

অভিযানের সময় পাহাড়ি ও দুর্গম বিভিন্ন স্থানে একযোগে চিরুনি তল্লাশি চালানো হয়। সন্দেহভাজন আস্তানা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, পাহাড়ি পথ ও গোপন স্থাপনায় তল্লাশি করা হয়।

এ সময় বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ১২ জনকে আটক করা হয়। তল্লাশিতে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র (একটি পিস্তল ও একটি এলজি), চারটি কার্তুজ, ১১টি ককটেল, ১৭টি দেশীয় অস্ত্র, ১৯টি সিসি ক্যামেরা, দুটি ডিভিআর, একটি পাওয়ার বক্স এবং দুটি বাইনোকুলার উদ্ধার করা হয়েছে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জঙ্গল সলিমপুরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। একই ঘটনায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে অভিযানে গেলে র‍্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন।

এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করা হয়। মামলায় মোহাম্মদ ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করা হয় এবং আরও ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাতপরিচয় আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামি ধরতে গেলে র‍্যাব সদস্যদের ওপর ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালানো হয়। এক আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং চার র‍্যাব সদস্যকে অপহরণ করা হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করা হয়।

অভিযান চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। কোথাও রাস্তার ওপর ট্রাক আড়াআড়ি করে রাখা হয়, কোথাও কালভার্ট ভেঙে দেওয়া হয়, আবার কোথাও নালার স্ল্যাব তুলে ফেলা হয়। এসব বাধা অপসারণ করে ধাপে ধাপে অভিযান এগিয়ে নেওয়া হয়।

কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের খবর আগেই পেয়ে গিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। তাই আগের রাতেই এসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়।

তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের দুটি গ্রুপ সক্রিয়। একটি গ্রুপের নেতৃত্বে মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অন্যটির নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন জানুয়ারিতে র‍্যাব সদস্য হত্যার মামলার প্রধান আসামি। আলীনগর এলাকায় তার শক্ত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

অভিযানকারী কর্মকর্তারা জানান, আলীনগরে যৌথবাহিনীর প্রবেশ ঠেকাতেই মূল রাস্তায় ট্রাক রেখে ও কালভার্ট ভেঙে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে অভিযানের সময় সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, আলীনগরের প্রবেশমুখে একটি বড় ট্রাক আড়াআড়ি করে রেখে দেওয়া হয়েছিল। কিছু দূরে খালের ওপরের কালভার্ট ভেঙে দেওয়া হয় যাতে বাহিনীর যানবাহন ঢুকতে না পারে। পরে খাল ভরাট করে বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করানো হয়।

তিনি বলেন, এটি বড় ধরনের অভিযান হওয়ায় বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য এতে যুক্ত ছিলেন। এলাকার নিয়ন্ত্রণে থাকা সন্ত্রাসীদের নিজস্ব সোর্স থাকায় তারা কোনোভাবে আগেই অভিযানের খবর পেয়ে যেতে পারে।

অভিযান শেষে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল ও আলীনগর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সন্ত্রাসীদের পুনর্গঠনের সুযোগ বন্ধ করতে দুটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে জঙ্গল সলিমপুরের খাস জমি দখলমুক্ত করে সেখানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, স্পোর্টস ভিলেজ, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আইকনিক মসজিদ ও ইকো পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেয় সরকার। তবে উচ্ছেদ অভিযানে বারবার বাধার মুখে পড়ে প্রশাসন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকায় আবারও সন্ত্রাসী তৎপরতা বাড়ে। কয়েক দফা সংঘর্ষ ও খুনোখুনির ঘটনা ঘটে।

২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর ভোরে আলীনগর এলাকায় ইয়াছিন ও রোকন-গফুর বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। এতে রোকন বাহিনীর এক সদস্য নিহত ও কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক স্থানীয়দের হামলার শিকার হন।