tanaka
প্রচ্ছদইসলাম ও জীবনকথা ও কাজে কষ্ট পেলেও কি গুনাহ মাফ হয়? কাঁটা বিঁধলেও গুনাহ...

কথা ও কাজে কষ্ট পেলেও কি গুনাহ মাফ হয়? কাঁটা বিঁধলেও গুনাহ মাফের সুসংবাদ দিয়েছে ইসলাম

মানুষের জীবন কখনো আনন্দে ভরে ওঠে, আবার কখনো দুঃখ-কষ্ট, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা ও নানা বিপদ-আপদে ভারী হয়ে ওঠে। কিছু কষ্ট মানুষ নীরবে সহ্য করে, কিছু যন্ত্রণা কাউকে বলা যায় না। আবার এমন কিছু বেদনা থাকে, যা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন।

তবে একজন মুমিনের জন্য আশার কথা হলো, জীবনের কোনো কষ্টই আল্লাহর কাছে অর্থহীন নয়। ধৈর্য ও ঈমানের সঙ্গে বিপদ-আপদ সহ্য করলে তা গুনাহ মাফের কারণ হতে পারে। এমনকি শরীরে একটি কাঁটা বিঁধলেও এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা বান্দার কিছু গুনাহ ক্ষমা করে দেন। সুবহানাল্লাহ!

এ বিষয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এমন এক সুসংবাদ দিয়েছেন, যা বিপদে-আপদে মুমিনের হৃদয়ে সান্ত্বনা ও আশার আলো জ্বালায়।

১. কষ্ট মুমিনের গুনাহ মাফের কারণ

হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) ও আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا، إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ

অর্থ: ‘মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে ক্লান্তি, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আপতিত হয়, এমনকি তার শরীরে একটি কাঁটা বিঁধলেও এর বিনিময়ে আল্লাহ তার কিছু গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৬৪১–৫৬৪২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭৩)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মুমিনের জীবনের ছোট-বড় কোনো কষ্টই আল্লাহর কাছে মূল্যহীন নয়। মানুষের চোখে যে যন্ত্রণা সামান্য, আল্লাহর রহমতে সেটিও গুনাহ মোচনের কারণ হতে পারে।

২. বিপদ-আপদ মুমিনের জন্য পরীক্ষা

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন—

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ ۝ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ ۝ أُولَٰئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ

অর্থ: ‘আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জানমাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা বিপদে পতিত হলে বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত। আর তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫৫–১৫৭)

এই আয়াতগুলো মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার জীবন একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। জীবনে বিপদ আসা মানেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি নয়। বরং বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা করেন। ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ, রহমত ও সুসংবাদ।

৩. প্রতিটি কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তির প্রতিশ্রুতি

বিপদের মুহূর্তে অনেক সময় মানুষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। মনে হয়, এই দুঃসময় বুঝি আর শেষ হবে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন—

فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا ۝ إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا

অর্থ: ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে রয়েছে স্বস্তি।’ (সুরা আল-ইনশিরাহ, আয়াত ৫–৬)

এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অনন্য আশ্বাস। তাই বিপদে হতাশ না হয়ে তাঁর ওপর ভরসা রাখতে হবে, ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং রহমতের প্রত্যাশা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দুঃসময় যত দীর্ঘই মনে হোক, আল্লাহ চাইলে মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারেন।

৪. মুমিনের প্রতিটি অবস্থাতেই রয়েছে কল্যাণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ

অর্থ: ‘মুমিনের ব্যাপারটি সত্যিই বিস্ময়কর! তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়। তার জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি এলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর দুঃখ-কষ্টে পতিত হলে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে সেটিও তার জন্য কল্যাণকর হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৯৯)

একজন প্রকৃত মুমিন সুখের সময় অহংকারী হন না, আবার দুঃখের সময় আল্লাহর রহমত থেকেও নিরাশ হন না। সুখে তিনি শুকরিয়া আদায় করেন, আর বিপদে ধৈর্য ধারণ করেন। এভাবেই জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতি তাঁর জন্য কল্যাণের সুযোগ হয়ে ওঠে।

৫. বিপদে পড়লে মুমিনের করণীয়

জীবনে বিপদ-আপদ এলে একজন মুমিনের উচিত কয়েকটি বিষয় মেনে চলা—

  • ধৈর্য ধারণ করা: বিপদের সময় অধৈর্য না হয়ে আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করা।
  • আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা: বিশ্বাস রাখা, একমাত্র আল্লাহই বিপদ থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা রাখেন।
  • ইস্তিগফার করা: বেশি বেশি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করা এবং নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়া।
  • দোয়া করা: বিপদ থেকে মুক্তি, মানসিক প্রশান্তি ও সার্বিক কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা।
  • আশাবাদী থাকা: কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া।
  • প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া: অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণ করা এবং সমস্যার সমাধানে বৈধ ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া। কারণ সবর মানে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা নয়; বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সঠিক পথে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

কষ্টের মাঝেও আল্লাহর রহমতের আশা রাখুন

প্রিয় মুমিন ভাই ও বোনেরা, জীবনে যত কষ্টই আসুক, হতাশ হয়ে পড়বেন না। চোখের প্রতিটি অশ্রুবিন্দু, অসুস্থতার প্রতিটি মুহূর্ত, মনের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এবং জীবনের প্রতিটি কঠিন পরীক্ষা আল্লাহর অজানা নয়। মানুষের কাছে আপনার কষ্টের মূল্যায়ন না হলেও আল্লাহ তাআলা সবকিছু জানেন।

হয়তো যে অসুস্থতা আপনাকে বিছানায় শুইয়ে রেখেছে, সেটিই আপনার গুনাহ মাফের কারণ হচ্ছে। যে দুশ্চিন্তায় আপনার রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে, সেটিও হতে পারে পাপ মোচনের উসিলা। আর যে কষ্টে আপনি নীরবে কাঁদছেন, তার বিনিময়ে আল্লাহ আখিরাতে আপনাকে বিশেষ প্রতিদান দিতে পারেন।

তাই বিপদে ভেঙে পড়বেন না। ধৈর্য ধারণ করুন, নামাজে দাঁড়ান, আল্লাহর কাছে দোয়া করুন এবং তাঁর রহমতের ওপর আস্থা রাখুন। মনে রাখবেন, মুমিনের জীবনে কষ্ট আসতে পারে; কিন্তু ঈমান, সবর ও আল্লাহর ওপর ভরসার মাধ্যমে সেই কষ্টও কল্যাণের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনের সব দুঃখ-কষ্টকে গুনাহ মাফের উসিলা বানিয়ে দিন। বিপদে ধৈর্য ধারণের তাওফিক দান করুন। অসুস্থদের শিফা দিন, দুশ্চিন্তাগ্রস্তদের মনে প্রশান্তি দান করুন এবং আমাদের সবাইকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।