tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়গার্মেন্টস খাতে বিদেশি নির্ভরতা ছাড়াই শতভাগ দেশি জনবল সম্ভব: মাহদী আমিন

গার্মেন্টস খাতে বিদেশি নির্ভরতা ছাড়াই শতভাগ দেশি জনবল সম্ভব: মাহদী আমিন

দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বিদেশি কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুরো খাত দেশীয় মেধা ও দক্ষ জনবল দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

রোববার বিকেলে রাজধানীর বিজয় সরণির নভোথিয়েটারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘ইনোভেশন ইন অ্যাপারেল অ্যান্ড টেক্সটাইল: ড্রাইভিং কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড গ্রোথ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

মাহদী আমিন বলেন, প্রায় পাঁচ দশকের পুরোনো দেশের পোশাক শিল্পের বিভিন্ন কারখানা ও বায়িং হাউজে এখনও কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে দেশের মানুষের মেধা, যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এ শিল্পের সব পর্যায়ের দায়িত্ব সামলানো সম্ভব।

তার মতে, দেশের লক্ষ্য শুধু নিজস্ব দক্ষ জনবল তৈরি করে বিদেশি নির্ভরতা কমানোতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশি পেশাজীবীদের এমন পর্যায়ে দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের উচ্চপদে নিয়োগ দিতে আগ্রহী হয়। এজন্য কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা ও অনুকূল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

তরুণদের কর্মসংস্থান এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, টেকসই শিল্প প্রবৃদ্ধি, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

তিনি বলেন, পড়াশোনা শেষে তরুণরা যেন দেশের ভেতর সম্মানজনক কর্মজীবন গড়ে তুলতে পারে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারে, সে লক্ষ্যেই কাজ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মাহদী আমিন জানান, সরকার এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে শিক্ষার্থীরা মানবিক মূল্যবোধের পাশাপাশি পেশাগত দক্ষতা ও যোগাযোগের সক্ষমতা অর্জন করবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বাড়ানো এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জোরদারের মাধ্যমে পাঠ্যক্রমেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

এর আগে শনিবার সকালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত তিন দিনের মেলার দ্বিতীয় দিনে পোশাক ও টেক্সটাইল খাত নিয়ে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

গবেষণা ও দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ

বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অবস্থান ধরে রাখতে গবেষণা, উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ও দক্ষতার আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।

তার ভাষ্য, দক্ষ শ্রমশক্তি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও উন্নত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি পোশাকের নকশায় নতুনত্ব আনতে হবে। এ জন্য প্রতিটি কারখানায় গবেষণার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যম হয়, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের অজুহাত না হয়। দেশের বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থান তৈরিতে শ্রমজীবী মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পোশাক শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষায়িত শিক্ষা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও এক বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্স চালুর মাধ্যমে তরুণদের এ খাতের জন্য আরও প্রস্তুত করার আহ্বান জানান মাহদী আমিন।

একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে শিল্পের বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটাতে কারখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপের সুযোগ বাড়ানো, শিল্পের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ক্যাম্পাসে এনে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং নিয়মিত ক্যারিয়ার মেলার আয়োজনের ওপরও গুরুত্ব দেন।

তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার আশ্বাস

নতুন উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের সহায়তার বিষয়ে মাহদী আমিন বলেন, নতুন স্টার্টআপ উদ্যোগে প্রাথমিক মূলধন ও তহবিল সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সংকট ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার অভাবে অনেক উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অল্প সময়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব না হলেও সীমাবদ্ধতাকে সম্ভাবনায় রূপ দিতে সরকারের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই।

‘ওয়ান নেশন, ওয়ান ইনোভেশন’ ধারণার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী ও উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে। সরকার সহায়ক নীতি প্রণয়ন করবে এবং বেসরকারি খাত সেগুলো বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব ও জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমেই স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

একটি শিল্পের একক প্রচেষ্টায় দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য আসে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, পোশাক খাতের জন্য এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম প্রয়োজন, যেখানে শিল্পমালিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, ব্যাংকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নীতিনির্ধারকেরা সমন্বিতভাবে কাজ করবেন। এ কারণে আলোচনায় বৈশ্বিক ব্র্যান্ড, পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক ও সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের একসঙ্গে অংশগ্রহণকে তিনি ‘৩৬০ ডিগ্রি’ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে তরুণদের অংশগ্রহণের প্রশংসা করে মাহদী আমিন বলেন, তারাই ভবিষ্যতে শুধু পোশাক খাত নয়, পুরো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নেতৃত্ব দেবে।

আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস, এক্সপোর্ট বন্ড ও আইটি বিভাগের সদস্য ফারজানা আফরোজ, বিইউএফটির উপাচার্য ইঞ্জিনিয়ার ড. আইয়ুব নবী খান, এইচ অ্যান্ড এমের রিজিওনাল কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউর রহমান, এইচএসবিসি বাংলাদেশের করপোরেট অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনাল ব্যাংকিং ও গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ব্যাংকিংয়ের কান্ট্রি হেড শাদাব হোসেন এবং এইচএসবিসি বাংলাদেশের হেড অব গ্লোবাল অ্যাপারেল সাপ্লাই চেইন আশফাকুর রহমান।

আলোচনা শেষে মাহদী আমিন ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন। মেলায় সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ৭৩টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্বতন্ত্র গবেষক, শিক্ষার্থী, স্টার্টআপ, এসএমই এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা অংশ নিয়েছেন। প্রযুক্তি, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এক হাজারের বেশি উদ্ভাবন মেলায় প্রদর্শিত হচ্ছে।