গণতন্ত্রকে কার্যকর ও টেকসই করতে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, গণতন্ত্র রক্ষার অন্যতম প্রধান শক্তি গণমাধ্যম। তাই গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে হলে গণমাধ্যমকেও সুরক্ষিত রাখতে হবে।
মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নীতি ও বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের কথা স্মরণ
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এই সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক পরিসরের নয়, বরং দীর্ঘদিনের আত্মিক বন্ধন। জীবনের কঠিন সময়ে প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকরা তার পাশে ছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সাংবাদিকদের কল্যাণে নিজের অবস্থান থেকে সম্ভব সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, সাংবাদিক সমাজের জন্য তার করণীয় যতটুকু রয়েছে, তা করার চেষ্টা তিনি অব্যাহত রাখবেন।
এ সময় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা দৈনিক বাংলা ও অন্যান্য সংবাদপত্র পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সাংবাদিকদের ঐক্যের আহ্বান
সাংবাদিক সমাজের মধ্যে ঐক্যকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। তার মতে, বিভক্তি কোনো ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এনে দিতে পারে না।
তিনি বলেন, সাংবাদিকরা যদি মৌলিক ও পেশাগত বিষয়গুলোতে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেন, তাহলে সরকার ও বিরোধী দল—উভয়ের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব হবে।
সাংবাদিকদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনিয়ম ও গণহারে সাংবাদিক ছাঁটাইয়ের মতো পরিস্থিতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বন্ধ সংবাদপত্র চালুর তাগিদ
সংবাদকর্মীদের কর্মসংস্থানের সংকটের বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে। এ সংকট মোকাবিলায় বন্ধ হয়ে যাওয়া সংবাদপত্রগুলো পুনরায় চালুর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন রাষ্ট্রপতি।
তার মতে, বন্ধ থাকা পত্রিকা এবং বিশেষ ট্রাস্টের অধীনে থাকা সংবাদপত্রগুলো চালু করা সম্ভব হলে অন্তত এক হাজার সাংবাদিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
নতুন প্রজন্মের মধ্যে গণতান্ত্রিক মানসিকতা তৈরির আহ্বান
দেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তরুণ প্রজন্মের চিন্তা ও মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, এটি একটি সংস্কৃতিও। তাই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার পাশাপাশি মানুষের মনোজগতেও এর চর্চা তৈরি করতে হবে।
পুরোনো কর্তৃত্ববাদী চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন প্রজন্মের মধ্যে গণতান্ত্রিক ভাষা ও মূল্যবোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। শুধু আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন এলেই হবে না, মানুষের মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনতে হবে বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি।
সরকারের ভালো-মন্দ দুটোই তুলে ধরার আহ্বান
সরকারের যৌক্তিক ও গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি সরকারের ইতিবাচক কাজগুলোও গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে যথাযথভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
নির্বাচিত সরকারকে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে দেশে যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, সেটিও জনগণের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের উন্নয়নে সমন্বয়ের তাগিদ
জাতীয় প্রেস ক্লাবের দীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা উল্লেখ করেন।
দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে জাতীয় প্রেস ক্লাবের অবকাঠামো ও সামগ্রিক উন্নয়নে সরকারের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের ওপরও জোর দেন তিনি।
বৈঠকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ প্রতিনিধি দলের সদস্যদের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে প্রেস ক্লাবে আসার জন্য রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানান তিনি।
সাংবাদিক নেতাদের বিভিন্ন দাবি
প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অতীতের সম্পর্কের কথা স্মরণ করে বলেন, প্রেস ক্লাবের সঙ্গে তার সম্পর্ক পরিবারের সদস্যের মতো।
সদস্য কাদের গনি চৌধুরী অতীতে সাংবাদিকতায় অপসাংবাদিকতার প্রবণতার কথা তুলে ধরে দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ধারা অব্যাহত রাখতে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা কামনা করেন।
সদস্য সৈয়দ আবদাল আহমদও অতীতের বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত ১৭ বছর সাংবাদিকদের ওপর নানা ধরনের বাধা ও নিয়ন্ত্রণ ছিল। এর ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত হয়েছিল। বর্তমানে সাংবাদিকরা তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে লিখতে ও মত প্রকাশ করতে পারছেন—এই পরিবেশ যেন ভবিষ্যতেও বজায় থাকে, সে আহ্বান জানান তিনি।
সত্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকার গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের কাছে প্রকৃত তথ্য পৌঁছে দিতে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
এ সময় সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের কল্যাণে দ্রুত দশম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের জন্য সরকার ও রাষ্ট্রপতির সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়েও সাংবাদিক নেতারা রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা চাইলে তিনি প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।
প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য আবদুল হাই শিকদার, কাজী রওনাক হোসেন, জাহিদুল ইসলাম রনি, শাহনাজ বেগম পলি, মাসুমুর রহমান খলিলী ও এ কে এম মহসীন।
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, সচিব, প্রেস সচিবসহ বঙ্গভবনের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



