কানাডায় চাকরি ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখেন অনেক বাংলাদেশি। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা অনুমোদনপত্র এবং নকল ওয়েবসাইট ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
সম্প্রতি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ থানা এলাকায় এমন একটি প্রতারক চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মারিফুল ইসলাম ও বাচ্চা বাউ ওরফে হাসিনুর। তাঁদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও জাল পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা কানাডার ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসার কাগজ দেখিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতেন।
এই ধরনের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকতে হলে আগে জানতে হবে কানাডার প্রকৃত ওয়ার্ক ভিসা পাওয়ার নিয়ম।
প্রথমে বাস্তবতা বুঝুন
কানাডায় চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
কানাডায় বর্তমানে বেকারত্বের হার রয়েছে এবং দেশটিতে বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন, যারা স্থানীয় চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা করছেন। ফলে বিদেশ থেকে গিয়ে সহজেই উচ্চ বেতনের চাকরি পাওয়া বাস্তবে অনেক কঠিন।
কানাডার কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগ করলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আবেদন আসে। তাই আবেদনকারীর শিক্ষা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং ভাষাগত যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কানাডার প্রধান ভাষা ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ। ইংরেজির ক্ষেত্রে আইইএলটিএস বা সমমানের পরীক্ষায় ভালো ফল এবং ফ্রেঞ্চের ক্ষেত্রে টিইএফ (TEF) বা টিসিএফ (TCF) পরীক্ষার ফল অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে।
কানাডার ওয়ার্ক পারমিট কী?
কানাডার ওয়ার্ক পারমিট হলো বিদেশি নাগরিকদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেশটিতে কাজ করার অনুমতি। এটি কোনো স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নয়।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আবেদনকারীর আগে একটি বৈধ চাকরির অফার প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাকে প্রমাণ করতে হয় যে ওই পদে কানাডার নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা পাওয়া যায়নি। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় লেবার মার্কেট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (LMIA)।
তবে কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি, বিশেষ কর্মসূচি বা নির্দিষ্ট পেশার ক্ষেত্রে LMIA ছাড়াও ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হতে পারে।
বৈধ ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার সাধারণ ধাপ
প্রথম ধাপ: কানাডার কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রকৃত চাকরির প্রস্তাব পাওয়া।
দ্বিতীয় ধাপ: প্রয়োজন হলে নিয়োগকর্তার মাধ্যমে LMIA অনুমোদন নেওয়া।
তৃতীয় ধাপ: আবেদনকারীকে চাকরির অফার, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়।
চতুর্থ ধাপ: বায়োমেট্রিকস, নিরাপত্তা যাচাই ও অন্যান্য মূল্যায়নের পর কানাডার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়।
পঞ্চম ধাপ: ভিসা অনুমোদনের পর কানাডায় প্রবেশের সময় সীমান্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত যাচাই করে ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করেন।
মনে রাখতে হবে, কানাডার ভিসা শুধু ফেডারেল সরকার প্রদান করে। কোনো ব্যক্তি, এজেন্ট বা প্রাদেশিক সরকার ভিসা নিশ্চিত করতে পারে না।
যেসব কথা শুনলে সতর্ক হবেন
প্রতারকরা সাধারণত যেসব দাবি করে—
- ‘১০০ শতাংশ নিশ্চিত ভিসা’
- ‘ইন্টারভিউ ছাড়াই চাকরি’
- ‘দুই-তিন মাসেই স্থায়ী বাসিন্দা (PR)’
- ‘কোনো যোগ্যতা ছাড়াই উচ্চ বেতনের চাকরি’
- ‘ভাষা পরীক্ষার প্রয়োজন নেই’
এসব দাবি সাধারণত প্রতারণার লক্ষণ।
কানাডার সরকার বা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ কোনো আবেদনকারীকে আগাম ভিসার নিশ্চয়তা দেয় না। প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে যাচাই করা হয়।
প্রতারকরা যেভাবে ফাঁদে ফেলে
তদন্তে দেখা গেছে, প্রতারক চক্রগুলো সাধারণত—
- নামী প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া চাকরির অফার তৈরি করে;
- জাল LMIA বা ওয়ার্ক পারমিট দেখায়;
- ভুয়া ভিসা অনুমোদনপত্র তৈরি করে;
- সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে নকল ওয়েবসাইট বানায়;
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কানাডায় থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় ব্যবহার করে;
- দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দেয় এবং অগ্রিম অর্থ দাবি করে।
অনেক সময় তারা কানাডার ফোন কোড (+১) ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য মাধ্যমে যোগাযোগ করে। তবে কানাডার নম্বর দেখালেই ব্যক্তি সত্যিই কানাডায় অবস্থান করছেন—এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না।
চাকরির প্রস্তাব যাচাই করবেন যেভাবে
কানাডার চাকরির প্রস্তাব পেলে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি—
- প্রতিষ্ঠানটি সত্যিই নিবন্ধিত কি না;
- প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা, ওয়েবসাইট ও যোগাযোগের তথ্য মিলছে কি না;
- অফার লেটারে বেতন, দায়িত্ব ও কর্মস্থলের তথ্য বাস্তবসম্মত কি না;
- ই-মেইলটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ডোমেইন থেকে এসেছে কি না;
- ভিসা যাচাইয়ের জন্য দেওয়া ওয়েবসাইটটি সত্যিই সরকারি কি না।
অর্থ দেওয়ার আগে সতর্কতা
ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে বড় অঙ্কের টাকা পাঠানো থেকে বিরত থাকতে হবে। সব লেনদেনের রসিদ সংরক্ষণ করা উচিত।
কোনো নথিতে স্বাক্ষরের আগে তা ভালোভাবে পড়ে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে কানাডার অনুমোদিত ইমিগ্রেশন পরামর্শক বা আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
ওয়ার্ক পারমিট মানেই PR নয়
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কানাডার ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া মানেই স্থায়ী বসবাসের অধিকার পাওয়া নয়।
ওয়ার্ক পারমিট একটি অস্থায়ী কাজের অনুমতি। পরবর্তীতে কাজের অভিজ্ঞতা, ভাষাগত দক্ষতা, শিক্ষা ও অন্যান্য যোগ্যতার ভিত্তিতে কেউ স্থায়ী বাসিন্দার জন্য আবেদন করতে পারেন।
তাই ‘ওয়ার্ক পারমিট পেলেই নিশ্চিত পিআর’—এ ধরনের প্রচারণা বিভ্রান্তিকর।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
কানাডায় যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই একমাত্র পথ। দ্রুত ভিসা বা নিশ্চিত চাকরির প্রলোভনে না পড়ে তথ্য যাচাই করা জরুরি।
কানাডার চাকরি ও অভিবাসনের ক্ষেত্রে কোনো শর্টকাট নেই। সঠিক তথ্য, বৈধ প্রক্রিয়া এবং ধৈর্যই নিরাপদ অভিবাসনের মূল ভিত্তি।



