কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন করে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান (মহাপরিকল্পনা) প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে পূর্বের মাস্টারপ্ল্যানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ৫০ মিটার ও ৫০০ মিটারের বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন হোটেলগুলো ভেঙে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতে সিটি করপোরেশন ঘোষণার বিষয়েও আলোচনা চলছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পরিবেশগত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার পাশাপাশি দ্রুত পরিবেশগত ছাড়পত্র চেয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সচিবালয়ে কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বিষয়ক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা), পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন এবং ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনুসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ একটি বিস্তারিত উপস্থাপনা তুলে ধরে।
জানা গেছে, কক্সবাজারকে আধুনিক ও পরিকল্পিত পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ২০২২ সালে একটি মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা হয়েছিল। ১৭৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটি ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পায় এবং ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, যা ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
তবে বর্তমান সরকার ওই পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে আরও সময়োপযোগী ও সমন্বিত একটি নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই নতুন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন তিনটি সরকারি হোটেল ভেঙে আন্তর্জাতিক মানের নতুন হোটেল নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এ জন্য দ্রুত পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে। বৈঠকে শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের সফল পর্যটন উন্নয়ন মডেলও উপস্থাপন করা হয়।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কক্সবাজারকে ঘিরে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ও বড় পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ, রেল যোগাযোগ চালু এবং চট্টগ্রামের সঙ্গে উন্নত সড়ক যোগাযোগের মতো অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বয় করে কক্সবাজারকে আধুনিক ডিজিটাল পর্যটন নগরীতে রূপান্তর করা হবে।
তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনে কক্সবাজারকে অন্যতম প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পর্যটন, বাণিজ্য ও সেবা খাতের বিকাশের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে জেলার অবদান আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, উপকূলীয় এলাকায় প্রচলিত ৫০ মিটার ও ৫০০ মিটারের বিধিনিষেধ নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হবে। যেখানে পর্যটন উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে পরিকল্পিতভাবে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তবে পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করেই সব উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ রক্ষা করা অবশ্যই জরুরি, তবে এমন কঠোর বিধিনিষেধ থাকা উচিত নয়, যা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিকল্পিত উপকূলীয় উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন শিল্প বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মানের পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
বহুতল উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ছোট দেশ হওয়ায় পরিকল্পিত উল্লম্ব উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে হবে। এতে কৃষিজমি, জলাধার ও শিল্পাঞ্চল সংরক্ষণ সহজ হবে। বিশ্বের বড় পর্যটন নগরীগুলোও বহুতল অবকাঠামোভিত্তিক পরিকল্পনায় গড়ে উঠেছে এবং কক্সবাজারেও সেই মডেল অনুসরণ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে এবং তিনি এ সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া সবাই নতুন সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের বিষয়ে একমত হয়েছেন। ২০২৬ সালের মধ্যে পরিকল্পনাটি প্রস্তুত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ইকো-ট্যুরিজম এলাকা নির্ধারণ, মেরিন ড্রাইভ ও উপকূলীয় অঞ্চলের বিদ্যমান উন্নয়ন কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে উপকূলীয় এলাকায় যেসব বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে, সেগুলোর যৌক্তিকতা নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। কারণ এসব সীমাবদ্ধতার কারণে পর্যটন শিল্প প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হচ্ছে না এবং বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে। দেশীয় ও বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলাই এ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
এ লক্ষ্যে ভবিষ্যতে কক্সবাজারকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি ব্লু ইকোনমি ও সামুদ্রিক সম্পদ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, গভীর সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুরোপুরি চালু হওয়ার পর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কক্সবাজারে বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র, নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক, পানি শোধনাগারসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।



