ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা ও নগরবাসীর সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও জরিপ চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে মেয়র পদে কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
দলীয় সূত্র বলছে, মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা এবং নগরবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি নগর সেবায় কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতাকেও প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। জাতীয় নির্বাচনের পর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে বিএনপি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। ফলে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম ও পরীক্ষিত প্রার্থীদের পাশাপাশি নতুন মুখকেও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত পরিচিত ও পরীক্ষিত কাউকে দলীয় সমর্থন দেওয়া হবে, নাকি নতুন মুখ সামনে এনে চমক দেওয়া হবে—এ নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা চলছে। এদিকে মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও নিজেদের অবস্থান জানান দিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। এরই মধ্যে দুই সিটিতে মেয়র পদে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম আলোচনায় এসেছে।
সম্প্রতি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে তিনি সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে মহানগর নেতাদের সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ডের সাংগঠনিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেন এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দেন। দলীয় নেতারা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তালিকা যাচাই-বাছাই ও সমন্বয় করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সম্প্রতি গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন তারেক রহমান। সেখানে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয়ভাবে একজন প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙে একাধিক প্রার্থী যাতে মাঠে না থাকেন, সে বিষয়ে নেতাদের সতর্ক করা হয়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূলের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর নেতারা বসে একজন প্রার্থী ঠিক করবেন। এ ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ের নেতাদের সহযোগিতা নেওয়া হবে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাতে আর কেউ প্রার্থী না হন, সে বিষয়েও সাংগঠনিকভাবে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উত্তরে আলোচনায় তাবিথসহ একাধিক নাম
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে একাধিক নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। ২০১৫ ও ২০২০ সালের সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি। এ কারণে এবার উত্তর সিটিতে দল নতুন কাউকে বেছে নিতে পারে বলে বিএনপির ভেতরে আলোচনা রয়েছে।
উত্তর সিটির বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি তাবিথ আউয়াল, বিএনপির ক্ষুদ্র ঋণবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ কাইয়ুম এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব হাজী মোহাম্মদ মোস্তফা জামানের নামও শোনা যাচ্ছে।
হাজী মোহাম্মদ মোস্তফা জামান মানবজমিনকে বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে দল কাজ করছে। নির্বাচন কমিশন ভোটের তারিখ ঘোষণা করলে প্রস্তুতির গতি আরও বাড়বে। তিনি নিজেও উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে জানান। তবে দল শেষ পর্যন্ত যাকে সমর্থন দেবে, তার পক্ষেই কাজ করবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দক্ষিণে ইশরাক নাকি নতুন মুখ?
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেও সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। ২০২০ সালের নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন ইশরাক হোসেন। বর্তমানে তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। এবারও তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হবে, নাকি নতুন কাউকে সামনে আনা হবে—এ নিয়ে দলের মধ্যে চলছে আলোচনা। ইশরাক হোসেন এরই মধ্যে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া দক্ষিণ সিটিতে বর্তমান প্রশাসক আবদুস সালাম, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল এবং জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাসের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন মানবজমিনকে বলেন, দল তাদের সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নিতে বলেছে। এরই মধ্যে নয়টি সাংগঠনিক টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিম থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কাজ করবে। তবে দল এখনো কোনো প্রার্থী তালিকা তৈরি করতে বলেনি।
তিনি বলেন, যাদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এবং যারা আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের বিষয়ে দলকে অবশ্যই জানানো হবে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের তফসিল ঘোষণা করার পর প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক তৎপরতা আরও জোরালো হবে। ততদিনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক অবস্থান ও নগরবাসীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নও আরও স্পষ্ট হতে পারে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।



