২০৩০ সালের মধ্যে ২০% বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে
চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। শিল্পাঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ, নতুন গ্যাসকূপ খনন, দেশীয় উৎসে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে ভোলার গ্যাস কাজে লাগিয়ে সেখানেই শিল্প-কারখানা, সার কারখানা ও নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে এসব পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।
২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০ কূপ খননের পরিকল্পনা
সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আকস্মিক বা সাময়িক সংকটের সময় শিল্পখাত যাতে গ্যাসের ঘাটতিতে না পড়ে, সে জন্য সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
তিনি জানান, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সিসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সিসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হবে।
বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। এতে বিড দাখিলের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত।
এ ছাড়া স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ প্রণয়নের কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
বাড়ছে এলএনজি অবকাঠামো
প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গড়ে দৈনিক প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
ভবিষ্যতে আকস্মিক গ্যাস সংকট দেখা দিলে শিল্পখাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম চলছে।
এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের সুবিধাজনক কোনো স্থানে গভীর সমুদ্রে জরুরি ভিত্তিতে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে এনে আগ্রহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের বিষয়েও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গ্যাস প্রাপ্তি সাপেক্ষে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দীন খানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার।
লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করা হবে।
এ লক্ষ্যে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বায়ু, বর্জ্য, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সোলার ও অ্যাগ্রিভোলটেইক্সসহ অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
ভোলাতেই বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানা
সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোলা থেকে সরাসরি মূল ভূখণ্ডে গ্যাস নেওয়ার জন্য পাইপলাইন নির্মাণে অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে। তাই মূল ভূখণ্ডে গ্যাস নেওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষায় না থেকে ভোলাতেই শিল্প-কারখানা, সার কারখানা ও নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর মতে, ভোলার গ্যাসকে স্থানীয়ভাবেই কাজে লাগানো গেলে সেখানে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো সম্ভব হবে।
পাঁচ বছরের জন্য বিশেষ উন্নয়ন কাঠামো
ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি বিশেষ কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদের এ উন্নয়ন পরিকল্পনায় দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি ঠেকাতে ১৩ নির্দেশনা
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতা ঠেকাতে ১৩টি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, যথাযথ ব্যয় প্রাক্কলন না করা, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা, দুর্বল মনিটরিং এবং জবাবদিহিতার ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে সাধারণত একটি কারণ কাজ করে না। প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার একাধিক দুর্বলতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ সমস্যা তৈরি করে।
তিনি জানান, নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে নির্ভুল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন প্রস্তুতি দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনসংক্রান্ত বিদ্যমান নির্দেশিকা সময়োপযোগী করতে সংশোধন কার্যক্রম চলছে।
চলমান প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ড্যাশবোর্ড স্থাপন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা এবং মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকি বাড়ানো হয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও জোরদার করা হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।



