যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত পারমাণবিক আলোচনা আগামী শুক্রবার ওমানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে বৈঠকের আগেই দুই দেশের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য ও পারস্পরিক আস্থাহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই আলোচনায় অংশ নিতে সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ। খবরটি জানিয়েছে আল জাজিরা।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বুধবার রাতে নিশ্চিত করেন, শুক্রবার সকাল ১০টায় ওমানের রাজধানী মাস্কাটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে তেহরান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় সব আয়োজন সম্পন্ন করায় ওমানি ভাইদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ।
এর আগে আলোচনার স্থান ও কাঠামো নিয়ে মতবিরোধের কারণে বৈঠকটি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শেষ পর্যন্ত তুরস্কের পরিবর্তে ওমানেই আলোচনা আয়োজনের বিষয়ে একমত হয় দুই দেশ। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আল জাজিরাকে দুটি সূত্র জানিয়েছে, কাতার, তুরস্ক ও মিশরের মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে আলোচনার জন্য একটি নীতিগত কাঠামো উপস্থাপন করেছেন। প্রস্তাবিত কাঠামোর অন্যতম প্রধান বিষয় হলো—ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করার অঙ্গীকার।
এ ছাড়া এতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আলোচনার সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এই আলোচনা এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে উত্তেজনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত মাসে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আরব সাগরে মার্কিন সামরিক শক্তি জড়ো করার নির্দেশ দেন। এর ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক অভিযানের আশঙ্কা বেড়ে যায়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, আরও বিস্তৃত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চায়। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক ‘প্রক্সি’ গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি।
সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব দেশটির জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করে না। অন্য কোনো দেশে শাসকগোষ্ঠী ও জনগণের মধ্যে এত বড় ব্যবধান আছে বলে তিনি জানেন না।
উল্লেখ্য, ১৯৮০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবু গত কয়েক দশকে বিভিন্ন সময়ে আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা হয়েছে। চলতি বছরের জুনে ওমানেই দুই দেশের কর্মকর্তারা একটি পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তবে পরে ইসরাইলের ইরানে হামলার পর সেই প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র স্বল্প সময়ের জন্য ওই সংঘাতে যুক্ত হয়ে কয়েকটি ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
সব মিলিয়ে, ওমানের এই আলোচনা শুধু পারমাণবিক ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে আলোচনার ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তাই বেশি।



