tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়এলজিইডির ৯৬ পদে নিয়োগ নিয়ে নতুন জটিলতা, সিভিল ডিপ্লোমাধারীদের বৈষম্যের অভিযোগ

এলজিইডির ৯৬ পদে নিয়োগ নিয়ে নতুন জটিলতা, সিভিল ডিপ্লোমাধারীদের বৈষম্যের অভিযোগ

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীন উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে দীর্ঘ সাত বছর ধরে ঝুলে থাকা নিয়োগ প্রক্রিয়ার ৯৬টি সংরক্ষিত পদ নিয়ে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। আদালত ও আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে শুধু ডিপ্লোমা ইন কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংধারীদের নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে— এমন অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী প্রার্থীরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিগ্যাল নোটিশও পাঠানো হয়েছে।

প্রার্থীদের দাবি, বিপিএসসির ২০১৯ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে মোট ৭৬৩টি শূন্য পদ ছিল। এর মধ্যে একটি রিট মামলার কারণে ৯৬টি পদ সংরক্ষিত রাখা হয়। বাকি ৬৬৭টি পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফলাফলও প্রকাশ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর সংরক্ষিত ৯৬টি পদে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়াকে কেন্দ্র করেই নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আদালতের রায়কে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে সংরক্ষিত পদগুলোর বিপরীতে শুধু ডিপ্লোমা ইন কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংধারীদের মধ্য থেকে ৮৬ জনের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই ধরনের যোগ্যতা থাকা ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংধারীদের এ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হলে তা আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে বলে দাবি করছেন তারা।

স্মারকলিপি ও লিগ্যাল নোটিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। পরে ১৩ আগস্ট বিপিএসসি চেয়ারম্যানের কাছেও স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এরপর ১৭ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আনামুল হকের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশটি বিপিএসসি চেয়ারম্যান, সচিব ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব এবং এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর কাছেও পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পিএসসি। এতে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে কোনো স্বীকৃত ইনস্টিটিউট বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পুরকৌশলে অন্যূন দ্বিতীয় শ্রেণির ডিপ্লোমা নির্ধারণ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ডিপ্লোমা ইন কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংধারীদের আবেদন গ্রহণ করা হলেও মূল নিয়োগবিধিতে ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়া অন্যান্য ডিপ্লোমার শিক্ষাগত যোগ্যতার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

এ অবস্থায় রিট পিটিশন নং-১০০৮৬/২০২০ দায়ের করা হলে হাইকোর্ট বিভাগ ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর রুল জারি করেন। পরে ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে বলা হয়, আবেদনকারীদের প্রয়োজনীয় সনদপত্র পুনরায় প্রত্যয়নকারীদের কাছে দাখিল করতে হবে। যাচাই-বাছাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট পদে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা রয়েছে বলে প্রমাণিত হলে তাদের মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।

এ রায়ের বিরুদ্ধে এলজিইডি সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নং-১০৬৫/২০২৩ দায়ের করে। তবে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ আবেদনটি খারিজ করে দেন। ফলে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায় বহাল থাকে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, আদালতের রায়ের মূল বক্তব্য হলো— যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যোগ্যতা নির্ধারণ করা; কোনো নির্দিষ্ট ডিপ্লোমাধারীকে এককভাবে বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়।

প্রার্থীরা জানান, আদালতের রায়ের পর স্থানীয় সরকার বিভাগ আইন ও বিচার বিভাগের মতামত চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইন ও বিচার বিভাগ গত বছরের ১৯ মে এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ ১০ জুন দেওয়া মতামত ও নির্দেশনায় উল্লেখ করে, যাচাই-বাছাইয়ের পর আবেদনকারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমমানের প্রমাণিত হলে তাদের মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণে আইনগত কোনো বাধা নেই।

তবে সিভিল ডিপ্লোমাধারী ভাইভা প্রার্থীদের অভিযোগ, তারা পিএসসি চেয়ারম্যান ও ইউনিট-১-এর পরিচালকের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাতের চেষ্টা করেও সাড়া পাননি। সংরক্ষিত ৯৬টি পদের ফলাফল সম্মিলিতভাবে প্রকাশ করা হবে কি না, সে বিষয়েও তাদের স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। তাদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ শুধু কনস্ট্রাকশন ডিপ্লোমাধারী প্রার্থীদের বিষয়েই আলোচনা করছে।

প্রার্থীদের প্রশ্ন, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যেখানে পুরকৌশল বা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা উল্লেখ ছিল, সেখানে কনস্ট্রাকশন ডিপ্লোমাধারীদের আবেদন ও ভাইভায় অংশগ্রহণের সুযোগ কীভাবে দেওয়া হলো— কমিশনকে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।

তারা জানান, এ নিয়োগে ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ২ হাজার ২০৯ জন প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৬৬৭ জনের নিয়োগ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন সংরক্ষিত ৯৬টি পদের বিপরীতে শুধু ডিপ্লোমা ইন কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংধারীদের মূল্যায়ন করে ফল প্রকাশ করা হলে লিখিত পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ এবং মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বিপুলসংখ্যক সিভিল ডিপ্লোমাধারী প্রার্থী বৈষম্যের শিকার হবেন বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

ভুক্তভোগীদের দাবি, বিষয়টি সরাসরি আদালতের রায় ও আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই কোনো ধরনের একতরফা বা স্বার্থান্বেষী সিদ্ধান্ত না নিয়ে সব পক্ষের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করে স্বচ্ছ, সুষম ও পেশাদার প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এ বিষয়ে পিএসসির চেয়ারম্যানের পদত্যাগের কারণে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, “বিষয়টি খোঁজ নিয়ে আইনি সব দিক যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”