এআই চ্যাটবট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ভাষা বুঝতে এবং স্বাভাবিকভাবে কথোপকথন চালাতে ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) ও লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) প্রযুক্তি ব্যবহার করে। বিপুল পরিমাণ তথ্য দিয়ে এসব মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেই প্রশিক্ষণ থেকে শেখা ভাষার ধরন, তথ্য ও বিভিন্ন প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করেই মডেল ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে।
তবে এখানেই আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এআইয়ের প্রশিক্ষণ তো নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। তাহলে আপনি যখন জানতে চান, আজ ঢাকার তাপমাত্রা কত, এই মুহূর্তে সোনার দাম কত কিংবা এখনকার ব্রেকিং নিউজ কী, তখন এআই এত দ্রুত সর্বশেষ তথ্য জানায় কীভাবে?
চ্যাটজিপিটি বা ক্লডে ‘Searching’ লেখা দেখলে অনেকের মনে হতে পারে, এআই নিজেই ইন্টারনেটে ঢুকে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘুরে তথ্য খুঁজছে। আসলে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। LLM নিজস্বভাবে সরাসরি ওয়েব ব্রাউজ করে না। ওয়েব থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য মডেলের সঙ্গে নির্দিষ্ট সার্চ বা অন্যান্য টুল সংযুক্ত থাকে।
অর্থাৎ, এআই মডেল, ওয়েব সার্চ এবং ক্লাউড সার্ভারের সমন্বিত কাজের মাধ্যমেই রিয়েলটাইম তথ্যভিত্তিক উত্তর তৈরি হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণভাবে কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়।
ধাপ ১: আপনি প্রশ্ন করেন
প্রথমে আপনি চ্যাটজিপিটি, ক্লড বা জেমিনির মতো কোনো এআই চ্যাটবটে প্রশ্ন লিখলেন—‘আজ ঢাকার তাপমাত্রা কত ডিগ্রি সেলসিয়াস?’
ধাপ ২: এআই বুঝে নেয় আপনার কী তথ্য প্রয়োজন
চ্যাটজিপিটি, ক্লড বা জেমিনি মূলত লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM)-ভিত্তিক সিস্টেম। এসব মডেল মানুষের লেখা টেক্সট বিশ্লেষণ ও তৈরি করতে পারে।
আপনার প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে মডেল বুঝতে পারে, এটি এমন একটি তথ্য, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। ফলে শুধু প্রশিক্ষণের সময় পাওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সর্বশেষ তথ্য খোঁজার প্রয়োজন রয়েছে।
ধাপ ৩: প্রয়োজনীয় টুল ব্যবহারের নির্দেশ তৈরি হয়
এরপর মডেল সরাসরি ইন্টারনেট ব্রাউজ না করে প্রয়োজনীয় টুল ব্যবহারের জন্য একটি নির্দেশ তৈরি করে। সেখানে আপনার প্রশ্নের ভিত্তিতে কী তথ্য খুঁজতে হবে, তার একটি নির্দিষ্ট কোয়েরি থাকতে পারে।
এ ধরনের প্রক্রিয়াকে সাধারণভাবে ‘ফাংশন কলিং’ বা টুল কলিং বলা হয়।
ধাপ ৪: ব্যাকএন্ড সার্ভার ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজে
মডেলের তৈরি করা অনুরোধটি সংশ্লিষ্ট ক্লাউড অবকাঠামোর ব্যাকএন্ডে যায়। এরপর সেই সিস্টেম প্রয়োজনীয় টুল ব্যবহার করে ইন্টারনেট বা নির্দিষ্ট তথ্যের উৎস থেকে সর্বশেষ তথ্য সংগ্রহ করে।
অর্থাৎ, এআই মডেল নিজে ব্রাউজার খুলে ওয়েবসাইটে ঘোরে না; বরং তার হয়ে নির্ধারিত সফটওয়্যার টুল এই কাজটি সম্পন্ন করে।
ধাপ ৫: সার্চ ইঞ্জিন বা ওয়েব উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ
প্রয়োজন অনুযায়ী গুগল, বিং কিংবা অন্য কোনো সার্চ সেবা বা নির্দিষ্ট ওয়েব উৎস থেকে তথ্য খোঁজা হয়। সেখান থেকে সাম্প্রতিক ও প্রাসঙ্গিক ওয়েবপেজ বা তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
রিয়েলটাইম প্রশ্নের ক্ষেত্রে এই ধাপটিই এআইকে তার পুরোনো প্রশিক্ষণ তথ্যের বাইরে গিয়ে নতুন তথ্য পাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
ধাপ ৬: সংগৃহীত তথ্য মডেলের কাছে পাঠানো হয়
সার্চ থেকে পাওয়া তথ্য সরাসরি কাঁচা অবস্থায় ব্যবহার না করে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত ও টেক্সটে রূপান্তর করা হয়। এরপর প্রাসঙ্গিক তথ্যগুলো আবার এআই মডেলের কাছে পাঠানো হয়।
ধাপ ৭: মডেল তথ্য বিশ্লেষণ করে উত্তর তৈরি করে
এবার মডেল তার ভাষাগত সক্ষমতা ব্যবহার করে পাওয়া তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে। কোন তথ্যটি আপনার প্রশ্নের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক, তা বিবেচনা করে সেগুলো সাজিয়ে একটি সহজ, সংক্ষিপ্ত ও ব্যবহারযোগ্য উত্তর তৈরি করে।
অর্থাৎ, সার্চ সিস্টেম মূলত তথ্য খুঁজে আনে, আর LLM সেই তথ্য বোঝে, বিশ্লেষণ করে এবং মানুষের উপযোগী ভাষায় উপস্থাপন করে।
ধাপ ৮: আপনার স্ক্রিনে পৌঁছে যায় চূড়ান্ত উত্তর
সবশেষে তৈরি করা উত্তরটি আপনার চ্যাটবটের স্ক্রিনে প্রদর্শিত হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি—প্রশ্ন বোঝা, প্রয়োজনীয় টুল নির্বাচন, ওয়েব থেকে তথ্য খোঁজা, তথ্য প্রক্রিয়াজাত করা এবং উত্তর তৈরি—অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সম্পন্ন হয়।
তাই এআইয়ের ‘রিয়েলটাইম’ উত্তর দেওয়ার পেছনে শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভাষাগত সক্ষমতাই নয়, বরং LLM, সার্চ বা অন্যান্য টুল এবং ক্লাউড কম্পিউটিং অবকাঠামোর সমন্বিত কাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—ওয়েব থেকে তথ্য সংগ্রহ করলেও এআইয়ের দেওয়া উত্তর সবসময় শতভাগ নির্ভুল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মূল উৎস যাচাই করাও প্রয়োজন।



