tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়যেভাবে প্রিজন ভ্যান থেকে পালাল জেনেভা ক্যাম্পের মাদকসম্রাট পিচ্চি রাজা

যেভাবে প্রিজন ভ্যান থেকে পালাল জেনেভা ক্যাম্পের মাদকসম্রাট পিচ্চি রাজা

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, অর্থ আদায় ও সংঘর্ষের অভিযোগে আলোচিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একের পর এক অভিযান সত্ত্বেও সেখানে মাদকের কারবার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং পুরোনো কোনো অপরাধীর পতনের পর নতুন কারও উত্থান ঘটেছে—এমন অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের।

এই ক্যাম্পের অপরাধজগতের আলোচিত নাম রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’। একসময় পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করা এই তরুণই পরে হয়ে ওঠেন ক্যাম্পের অন্যতম শীর্ষ মাদক কারবারি। মাদক, অস্ত্র, হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ তার বিরুদ্ধে রয়েছে ৩০টির বেশি মামলা।

গত ১৯ মে নেপাল থেকে ঢাকায় ফেরার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিন্তু গ্রেপ্তারের চার মাসের মাথায় গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালত থেকে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার পথে গাজীপুরের নাওজোড় এলাকায় প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যান তিনি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে ভ্যান থেকে নামার পর সুযোগ নিয়ে পালিয়ে যান পিচ্চি রাজা। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পাঁচ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এরপর থেকেই ফের আলোচনায় উঠে এসেছে জেনেভা ক্যাম্পের এই আলোচিত মাদক কারবারির নাম।

পুলিশের সোর্স থেকে অপরাধজগতের ‘রাজা’

গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছে নিজের অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়ার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে পিচ্চি রাজা জানান—শুরুতে তিনি পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। তবে আয় কম হওয়ায় একপর্যায়ে একটি গ্যাস পাম্পে চাকরি নেন। সেখানে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টাকা আয় করতেন।

একটি ঘটনায় চাকরি হারানোর পর আবার জেনেভা ক্যাম্পে ফিরে আসেন তিনি। ২০১৮ সালে ক্যাম্পে পুলিশের অভিযানের সময় তাকে আটক করা হয়। ওই অভিযানে তার কাছ থেকে কোনো মাদক না পেলেও ৫১ পিস ইয়াবা উদ্ধারের মামলা দেওয়া হয় বলে তার দাবি। সেটিই ছিল তার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা।

প্রায় দুই মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে মাদক বিক্রি শুরু করেন পিচ্চি রাজা। প্রথম দিকে অল্প পরিমাণ মাদক কিনে বিক্রি করতেন। এতে দৈনিক প্রায় এক হাজার টাকা আয় হতো বলে পুলিশকে জানান তিনি।

পরে আবার কারাগারে গেলে সেখানে বিভিন্ন অপরাধীর সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর ধীরে ধীরে মাদক কারবারে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। একপর্যায়ে নিজেই মাদক ব্যবসা শুরু করেন এবং ক্রমে ক্যাম্পের মাদক কারবারের নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে যান।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, এরও আগে, ২০১৪ সালের পর অল্প বয়সেই ক্যাম্পের মাদক কারবারি ইশতিয়াকের সঙ্গে যুক্ত হন রাজা। একই সময়ে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স হিসেবেও কাজ করতেন। ফলে ক্যাম্পের অপরাধজগতের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সদস্যের সঙ্গেও তার যোগাযোগ তৈরি হয়।

২০২০ সালে করোনাকালে ইশতিয়াকের মৃত্যুর পর ক্যাম্পের একটি অংশের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ পিচ্চি রাজার হাতে আসে বলে স্থানীয়দের দাবি।

টেকনাফ থেকে চালান, ক্যাম্পে সরবরাহের নেটওয়ার্ক

একপর্যায়ে টেকনাফ থেকে মাদকের চালান এনে জেনেভা ক্যাম্পে সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন পিচ্চি রাজা—এমন অভিযোগ রয়েছে।

৫ আগস্টের পর ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বুনিয়া সোহেলসহ কয়েকটি গ্রুপের সঙ্গে তার বিরোধ তীব্র হয়। মাদকের স্পট নিয়ন্ত্রণ, এলাকার লাইনম্যান নিয়োগ, অর্থ আদায় এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এসব ঘটনায় ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।

পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যে পিচ্চি রাজা বলেন, ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পের বিভিন্ন পক্ষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে ‘রাজত্ব’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। সেখান থেকেই ধারাবাহিক সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।

ক্যাম্পের সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে বুনিয়া সোহেলের নামও তার বক্তব্যে বারবার এসেছে। পিচ্চি রাজার ভাষ্য অনুযায়ী, বুনিয়া সোহেল এমন অবস্থান চেয়েছিলেন, যেখানে ক্যাম্পে তার ওপরে আর কেউ থাকবে না। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা তাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন—এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি তিনি।

স্থানীয়দের দাবি, বুনিয়া সোহেলের ওপর হামলা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের পর ক্যাম্পের মাদক নিয়ন্ত্রণে নতুন করে পিচ্চি রাজার প্রভাব বাড়ে। গত বছরের অক্টোবরে বুনিয়া সোহেলের আস্তানায় হামলা ও লুটপাটের সময়ও পিচ্চি রাজাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে প্রভাব বিস্তারের কথা বলতে শোনা গেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

মাদক কারবারের টাকায় সম্পদের অভিযোগ

পিচ্চি রাজার বিরুদ্ধে মাদক কারবারের পাশাপাশি বিপুল অর্থ-সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন পারিবারিক ও ব্যবসায়িক কাজে বিনিয়োগ করা হয়েছে। তার শ্বশুর খোরশেদ, শালা নয়ন এবং ফুফাতো ভাই রনিসহ কয়েকজন আত্মীয় এই অর্থ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয়দের দাবি।

তাদের আরও দাবি, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পিচ্চি রাজার ২৫ থেকে ৩০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পত্তি রয়েছে।

তবে এসব সম্পদ ও অর্থের উৎস সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সহযোগীদের নিয়েও রয়েছে অভিযোগ

পিচ্চি রাজার সঙ্গে মাদক কারবার ও অন্যান্য অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে আদি, নবাব, শাহজাদা, ফাইজান, বেলুন, রুবেল, রনি, নাটা সুমন, সুজন, ব্যাটারি কামরান, হীরা ও মঈন পিচ্চিসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, তাদের কেউ কেউ মাদক সরবরাহ, কেউ অর্থ আদায়, আবার কেউ দখল নিশ্চিত করা ও প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানোর কাজে যুক্ত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো অপরাধী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স হিসেবে যোগাযোগ তৈরি করে পরে সেই পরিচয়কে নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের কাজে ব্যবহার করে। এতে একজন অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও তার জায়গায় নতুন অপরাধীর উত্থান ঘটে।

‘কে সোর্স, কে নয়—তা মুখ্য নয়’

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, ‘কে আমাদের সোর্স আর কে আমাদের সোর্স নয়, এটা আমাদের কাছে মুখ্য বিষয় নয়। তিনি অপরাধী কি না, সেটাই আমাদের কাছে প্রধান বিষয়।’

তিনি বলেন, ক্যাম্পের সব অপরাধীকে গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান চলছে। পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তারেও পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।

৩০টির বেশি মামলা

মাত্র ২৭ বছর বয়সেই পিচ্চি রাজার বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ ৩০টির বেশি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এর মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর থানাতেই মামলা রয়েছে ২৯টি।

এসব মামলার মধ্যে তিনটি হত্যা, সাতটি হত্যাচেষ্টা, চারটি বিস্ফোরক এবং ১৩টি মাদকসংক্রান্ত মামলা রয়েছে।

এতগুলো মামলার আসামি হওয়ার পরও কীভাবে তিনি প্রিজন ভ্যান থেকে পালানোর সুযোগ পেলেন—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

পিচ্চি রাজার খোঁজে থানায় মামলা

পিচ্চি রাজা পালানোর ঘটনায় গাজীপুরের কোনাবাড়ী থানায় মামলা হয়েছে।

যুগান্তর প্রতিবেদনের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, ঘটনার দুদিন পরও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতেখার হোসেন বলেন, থানার উপপরিদর্শক বিশ্বজিৎ মজুমদার বাদী হয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে মামলাটি করেন।

মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে পিচ্চি রাজাকে। তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে।

একদিকে জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবার ও আধিপত্য বিস্তার ঘিরে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অন্যদিকে একাধিক মামলার আসামি হয়েও প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা—সব মিলিয়ে পিচ্চি রাজাকে ঘিরে নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এখন তার অবস্থান শনাক্ত করে ফের গ্রেপ্তার করাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।