সাভারের আশুলিয়ায় প্রীতি কম্পোজিট কারখানায় গ্যাস সিলিন্ডারবাহী গাড়িতে বিস্ফোরণ ও পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পর সোমবার থেকে তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। ফলে সকালে কর্মস্থলে এসে বন্ধের নোটিশ দেখে ফিরে যেতে হয়েছে শ্রমিকদের।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এরই মধ্যে দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকায় এলাকাটিতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন
সোমবার দুপুরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহিদ কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খুদেবার্তায় জানান, সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামানকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।
কমিটি দুর্ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে। জাহিদ কামাল জানান, ঘটনার দিন আগুন নেভানোর সময়ই প্রাথমিকভাবে তদন্ত করা হয়েছিল। সেই তদন্তে পাওয়া তথ্যও মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
বিস্ফোরণে আধা কিলোমিটার এলাকায় ক্ষতি
সোমবার সকালে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা যায়, আগের দিনের বিস্ফোরণ ও আগুনে কারখানা এবং আশপাশের প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দ ও শক্তিতে গ্যাস সিলিন্ডারের বিভিন্ন অংশ দূরে ছিটকে পড়ে। এতে আশপাশের প্রায় ৩০টি বাড়ি এবং জামগড়া কবরস্থান এলাকাতেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
দুর্ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান এবং স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। তবে আহতের সঠিক সংখ্যা ও সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তদন্ত শেষ হওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠনের আগেই সোমবার ভোর থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দিয়ে দুর্ঘটনাস্থল পরিষ্কার করা হয়েছে। তাদের দাবি, এর ফলে বিস্ফোরণের গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
১১ গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার আনার অভিযোগ
দুর্ঘটনার আগে ১১টি গাড়িতে সিএনজি ও এলপিজি সিলিন্ডার ভর্তি করে কারখানায় নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাভারের লালন সিএনজি পাম্প, হেমায়েতপুর এলপিজি গ্যাস স্টেশন, রেডিও কলোনির সারাহা ফুয়েল স্টেশনসহ আরও দুটি স্থানীয় পাম্প থেকে এসব গ্যাস সংগ্রহ করা হয়।
কারখানা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বয়লার চালানোর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে আগের রাত থেকে সিলিন্ডারগুলোতে গ্যাস ভরা হচ্ছিল।
কারখানার একটি সূত্র আরও দাবি করেছে, সিলিন্ডারগুলোর বেশিরভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে কয়েকটি সিলিন্ডার প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছিল বলেও সূত্রটির দাবি। গাড়ি থেকে সিলিন্ডার নামানোর সময়ই বিস্ফোরণ ঘটে বলে জানানো হয়েছে।
তবে সিলিন্ডারগুলোর মেয়াদ, গ্যাস সংগ্রহের বৈধতা এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তসাপেক্ষ বিষয়।
রোববার সন্ধ্যায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ
রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার এস সুহি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে অবস্থিত প্রীতি কম্পোজিট কারখানায় গ্যাস সিলিন্ডারবাহী গাড়িতে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পাঁচটি গাড়িতে আগুন ধরে যায়।
ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে অন্তত সাতজন নিহত হন। আহত হন আরও অন্তত ৪০ জন শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দা।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ঘটনার পর কারখানা কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়নি বলে জানা গেছে।
সাতজন নিহত, পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা
আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম সোমবার দুপুরে জানান, বিস্ফোরণের ঘটনায় মোট সাতজন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে দুজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে।
তিনি জানান, কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। তবে সোমবার দুপুর পর্যন্ত কোনো পক্ষ মামলা করার আবেদন করেনি।
সাভার ফায়ার সার্ভিসের সাভার জোনের ইনচার্জ স্টেশন অফিসার হাফিজুর রহমান জানান, বিস্ফোরণের তীব্রতায় কারখানা চত্বরসহ আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লরির ভেতর ও নিচ থেকে পাঁচজনসহ মোট সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনায় অন্তত ৪০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। সিলিন্ডারগুলো স্থানীয়ভাবে যে পদ্ধতিতে ভর্তি করা হয়েছে, সেটিকে তিনি সম্পূর্ণ অবৈধ বলে মন্তব্য করেন।
নিহতদের পরিচয় নিয়ে দুই ধরনের তথ্য
নিহতদের পরিচয় শনাক্তের বিষয়ে পুলিশ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ দুজনের পরিচয় শনাক্তের কথা জানালেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রের বরাতে তিনজনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
নিহতদের মধ্যে বুলবুল হোসেন (৪৫) ও নজরুল ইসলাম (৪২) কারখানার আশপাশে ফুটপাতে ব্যবসা করতেন। আর মোসাম্মাৎ জয়নব (৫৫) ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ঘটনাস্থলের পাশে তার একটি টেইলারিংয়ের দোকান ছিল। তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকার মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী।
সোমবার সকালে ময়নাতদন্ত শেষে জয়নবের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অন্য মরদেহগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। বাকি নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আশুলিয়ার এই দুর্ঘটনার পর কারখানায় গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের নিরাপত্তা, সেগুলোর বৈধতা ও মেয়াদ, কারখানা চত্বরে সংরক্ষণ এবং বিস্ফোরণের আগে সেগুলো ব্যবহারের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিষ্কার করে আলামত নষ্ট হওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিও তদন্তে গুরুত্ব পেতে পারে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বিস্ফোরণের কারণের পাশাপাশি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের নিয়ম, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বের বিষয়গুলোও উঠে আসার কথা।



