রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মারকে ‘সাথী’ পদ থেকে বহিষ্কারের কারণ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। সংগঠনটির প্রকাশিত কয়েকটি চিঠিতে আম্মারের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে পদ-বাণিজ্য, সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর ‘যথাযথ জবাব’ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশ্যে আসা তিনটি চিঠিতে আম্মারকে শিবির থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি উঠে আসে। বিষয়টি সামনে আসার পর ক্যাম্পাসে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
কয়েকটি ছাত্রসংগঠন অভিযোগ করেছে, পরবর্তী রাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক সুবিধা নিতেই আম্মারকে শিবির থেকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে উপস্থাপনের কৌশল নেওয়া হয়েছে। তবে শিবির এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
চিঠিতে যেসব অভিযোগ
২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শাখা শিবিরের তৎকালীন সভাপতি এবং বর্তমান রাকসু ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে আম্মারের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়।
ওই চিঠিতে আম্মারের ‘সাথী’ পদ স্থগিত রেখে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়।
পরবর্তী একটি চিঠিতে বলা হয়, অভিযোগগুলোর ‘যথাযথ জবাব’ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংগঠনের মাসিক সেক্রেটারিয়েট বৈঠকে আম্মারের ‘সাথী’ পদ বাতিল এবং তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ ছাড়া ৩১ জুলাই শাখা শিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সালের স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠিতে আম্মারের বহিষ্কারের বিষয়টি উল্লেখ করে সংগঠনের নেতাকর্মীদের তার সঙ্গে যোগাযোগ না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে তার কর্মকাণ্ড এবং ‘ক্ষেত্রবিশেষে ফৌজদারি অপরাধে জড়িত হওয়ার’ অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক কৌশলের অভিযোগ
আম্মারকে বহিষ্কারের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর কয়েকটি ছাত্রসংগঠন এটিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছে।
তাদের দাবি, রাকসু নির্বাচনে ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে আম্মারের জিএস নির্বাচিত হওয়া এবং ওই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মেহেদী সজীবের পরবর্তী সময়ে শাখা শিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা ছিল।
ছাত্রসংগঠনগুলোর অভিযোগ, রাকসু নির্বাচনে ‘ডামি প্যানেল’ ব্যবহারের অভিযোগের সঙ্গে আম্মারের বিষয়টি যুক্ত। তবে শিবির বলছে, রাকসু নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি আগে আম্মারকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ফলে তাকে কোনো ‘ডামি প্যানেল’-এর মাধ্যমে নির্বাচনে আনার অভিযোগের ভিত্তি নেই।
অভিযোগ অস্বীকার আম্মারের
নিজের বিরুদ্ধে শিবিরের আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সালাহউদ্দিন আম্মার। গত বুধবার রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ২০২৫ সালে তাকে নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা ও অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে তিনি পরে জানতে পারেন।
নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার অভিযোগ অস্বীকার করে আম্মার বলেন, তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন কমিটি গঠনের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, রাজশাহীর স্থানীয় শিক্ষার্থীরা একটি কমিটি নিয়ে তার কাছে এসেছিলেন। তবে ওই কমিটি গঠনের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে আম্মার বলেন, জুলাই আন্দোলন নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য তৎকালীন উপাচার্যের পরামর্শে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের কাছে পৃষ্ঠপোষকতার প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। পরে সেটিকে ‘চাঁদা চাওয়ার চিঠি’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
শিবিরের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে আম্মার বলেন, তিনি কখনোই শিবিরের সংশ্লিষ্টতা গোপন করেননি। তবে বর্তমানে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলে দাবি করেন।
তার দাবি, শিবির তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুললেও সেগুলোর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি। অর্থের বিনিময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পদ দেওয়ার অভিযোগের প্রমাণ দেওয়ার জন্যও শিবিরের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানান তিনি।
বহিষ্কারের ব্যাখ্যা শিবিরের
আম্মারকে বহিষ্কারের বিষয়ে শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, সংগঠনে কাউকে বহিষ্কার করা হলে সাধারণত তা প্রকাশ্যে জানানো হয় না। প্রকাশ্যে আসা চিঠির বিষয়ে তিনি বলেন, সংগঠনের একজন সাবেক সদস্য ভুলবশত এটি প্রকাশ করেছেন এবং তার কাছে এর ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
বহিষ্কারের কারণ সম্পর্কে মেহেদী হাসান বলেন, আম্মারের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি যথাযথ জবাব দেননি। এ কারণে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রশিবির আম্মারের কোনো কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেনি। রাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সংগঠনের প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে শুধু সমন্বয় করেছেন; এটিকে সমর্থন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।



