মুখের একেবারে পেছনে সবার শেষে যে দাঁতটি গজায়, সেটিই পরিচিত ‘আক্কেল দাঁত’ নামে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর নাম থার্ড মোলার। সাধারণত কৈশোর পেরিয়ে ১৭ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে এই দাঁত মাড়ি ভেদ করে বের হয়। মানুষের পরিণত বয়সে এটি ওঠে বলে ইংরেজিতে একে ‘উইজডম টুথ’ বলা হয়। তবে সবার ক্ষেত্রে এই দাঁত স্বাভাবিকভাবে গজায় না; বরং অনেকের জন্য এটি তীব্র ব্যথা ও বিভিন্ন মুখের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন ও যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ মানুষের আক্কেল দাঁত এই বয়সসীমার মধ্যেই ওঠে। আবার কারও ক্ষেত্রে আরও পরবর্তী বয়সেও এটি দেখা দিতে পারে।
সাধারণভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর ও নিচের চোয়ালের চার প্রান্তে চারটি আক্কেল দাঁত থাকার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু বাস্তবে সবার চারটি দাঁত গজায় না। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি ১০ জনের মধ্যে অন্তত আটজনের একটি বা একাধিক আক্কেল দাঁত অনুপস্থিত থাকতে পারে।
বিবর্তনের সঙ্গে আক্কেল দাঁতের সম্পর্ক
মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসেও আক্কেল দাঁতের উপস্থিতির ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। প্রাচীন মানুষের খাদ্যাভ্যাসে শক্ত ফল, বীজ ও কাঁচা মাংসের মতো খাবারের পরিমাণ বেশি ছিল। এসব খাবার চিবিয়ে খাওয়ার জন্য অতিরিক্ত পেষণ দাঁতের প্রয়োজন হতো।
পরবর্তী সময়ে রান্না করা খাবারের প্রচলন এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের চোয়ালের আকারও ধীরে ধীরে ছোট হয়েছে। ফলে আধুনিক মানুষের চোয়ালে অনেক সময় অতিরিক্ত এই দাঁতটি বের হওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না।
জায়গার অভাব থেকেই শুরু হতে পারে নানা জটিলতা। দাঁতটি পর্যাপ্ত স্থান না পেলে মাড়ির ভেতর বা চোয়ালের হাড়ে আটকে যেতে পারে। এমন অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ইমপ্যাক্টেড টুথ’ বলা হয়।
আবার আক্কেল দাঁত আংশিকভাবে মাড়ির বাইরে বের হলে দাঁতের চারপাশে থাকা মাড়ির ফাঁকে খাবারের অংশ ও জীবাণু জমে যেতে পারে। সেখান থেকে সংক্রমণ ও প্রদাহ তৈরি হলে তাকে ‘পেরিকোরোনাইটিস’ বলা হয়।
শুধু ব্যথা নয়, হতে পারে আরও সমস্যা
আক্কেল দাঁতের সংক্রমণে মাড়ি ফুলে যাওয়া ও তীব্র ব্যথার পাশাপাশি মুখ খুলতে এবং খাবার গিলতেও সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে দাঁতে ক্যাভিটি তৈরি হওয়া, দাঁতের গোড়ায় সিস্ট বা পুঁজ জমা এবং পাশের সুস্থ দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
দন্ত চিকিৎসকদের মতে, চোয়ালে পর্যাপ্ত জায়গা থাকলে এবং দাঁতটি সঠিক অবস্থানে উঠলে আক্কেল দাঁত নিয়ে কোনো সমস্যা নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে দাঁতটি তুলে ফেলার প্রয়োজন নেই।
তবে বারবার সংক্রমণ, তীব্র ব্যথা, দাঁত আটকে থাকা কিংবা আশপাশের দাঁতের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিলে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দাঁতটি অপসারণের পরামর্শ দিতে পারেন।
মাড়ির সংক্রমণ দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করালে বিরল ক্ষেত্রে তা মুখ ও গলার গভীর অংশে ছড়িয়ে যেতে পারে। গুরুতর অবস্থায় ‘লুডউইগস অ্যাঞ্জাইনা’র মতো প্রাণঘাতী সংক্রমণও হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
দাঁত তোলার পর কী করবেন
সাধারণত স্থানীয় অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে আক্রান্ত স্থান অবশ করে আক্কেল দাঁত অপসারণ করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর পুরোপুরি সুস্থ হতে ব্যক্তিভেদে কয়েক দিন থেকে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
এ সময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবনের পাশাপাশি কুসুম গরম লবণপানি দিয়ে মুখ পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। শক্ত খাবারের পরিবর্তে নরম বা তরল খাবার খাওয়া আরামদায়ক হতে পারে।
অস্ত্রোপচারের পর ক্ষতস্থানে তৈরি হওয়া রক্তের জমাট যাতে সরে না যায়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হয়। এ সময় ধূমপান ও শক্ত খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি। রক্তের জমাট সরে গেলে ‘ড্রাই সকেট’ তৈরি হতে পারে, যার ফলে ক্ষতস্থানে আবার তীব্র ও যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা দেখা দিতে পারে।
তাই আক্কেল দাঁত ওঠার সময় ব্যথা বা মাড়ি ফুলে গেলে নিজে থেকে চিকিৎসা না করে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।



