tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশঅপ্রতিম হত্যা: আইফোন ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ৫ হাজার টাকার বিরোধও পুলিশের নজরে

অপ্রতিম হত্যা: আইফোন ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ৫ হাজার টাকার বিরোধও পুলিশের নজরে

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যার ঘটনায় একাধিক সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা সামনে এলেও তদন্তে পাঁচ হাজার টাকা ধার দেওয়া নিয়ে এক কিশোরের সঙ্গে তার বিরোধের তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে এই বিরোধ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্তকারীরা।

পুলিশের ভাষ্য, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য থেকেই ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে। এ ঘটনায় অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের করা মামলায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শনিবার সকাল ৯টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। সে সময় অপ্রতিমের মৃত্যুর বিষয়টি তদন্তকারীদের জানা ছিল না। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা জানতে পারেন, অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রথমে হত্যাকাণ্ডে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তুহিন। তবে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদের পর শনিবার রাত ৮টার দিকে তিনি ঘটনায় নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যদিও ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের নাম প্রকাশ করতে তিনি অনাগ্রহ দেখান।

জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যেই তুহিনের মোবাইলে একাধিকবার ফোন আসে। ফোনদাতা ছিলেন অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক কিশোর। বিষয়টি পুলিশের সন্দেহের কারণ হলে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পুলিশ জানায়, আটকের সময় ওই কিশোরের পরনে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা একটি টি-শার্ট ছিল।

পরে তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও এক কিশোরকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।

প্রতিষ্ঠানে কাজ করত গ্রেপ্তার কিশোররা

পুলিশ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার কিশোরদের একজন গত ২ সেপ্টেম্বর অপ্রতিমের বাবার মোবাইল সরঞ্জাম বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে ডেলিভারিম্যান হিসেবে যোগ দিয়েছিল। মাসিক ১৪ হাজার টাকা বেতনে তার চাকরি হলেও তখনো কোনো লিখিত চুক্তি হয়নি।

অন্য এক কিশোরও প্রতিষ্ঠানটিতে বিনা বেতনে কাজ করত বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা।

৫ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধের তথ্য

তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, অপ্রতিম ওই কিশোরদের একজনকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল। সম্প্রতি সেই টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য অপ্রতিমের চাপের কারণে ওই কিশোরের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। এমনকি অপ্রতিম মারা গেলে তাকে আর ধার করা টাকা ফেরত দিতে হবে না—এমন চিন্তাও তার মধ্যে তৈরি হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তবে এই বিরোধ হত্যার মূল কারণ ছিল কি না, সেটি এখনো তদন্তাধীন।

সিসিটিভিতে থাকা যুবককে শনাক্ত

অপ্রতিমের বাবা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পরও ছেলে বাড়িতে না ফেরায় ফাহাদকে ফোন করে ডেকে আনা হয়। অপ্রতিম কোথায় গেছে, সে বিষয়ে খোঁজ নিতে বলা হয় তাকে।

পরে পরিবারের কাছে থাকা সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা এক যুবককে দেখে ফাহাদ তাকে তুহিন হিসেবে শনাক্ত করেন। এরপর ফাহাদকে দিয়ে তুহিনের মোবাইলে ফোন করানো হয়। তখন তুহিন অপ্রতিম তার কাছে আসেনি বলে জানায়। সময়টি ছিল রাত প্রায় ১০টা।

অপ্রতিমের বাবা আরও জানান, শনিবার দুপুরে ছেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘটনাস্থলে যেতে ফাহাদকে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি শরীর খারাপের কথা বলে সেখান থেকে চলে যান।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাতের কথা বলছে পুলিশ

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন বনে অপ্রতিমের আইফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এ সময় অপ্রতিম বাধা দিলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে তুহিন বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন বলে পুলিশের ভাষ্য। পরে ফাহাদ ও মো. কামরুল হাসান (১৬) অপ্রতিমকে আঘাত করেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তুহিন তার ব্যবহৃত আইফোন নিয়ে অন্যদের সঙ্গে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে তদন্তকারীদের দাবি।

আগের ঘটনার প্রতিশোধের বিষয়টিও খতিয়ে দেখার দাবি

অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন ড. কামরুন নাহাত শীলা। অপ্রতিমের হত্যার সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন নাহিদা বেগম।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতির আয়োজিত মানববন্ধনে বিষয়টি তুলে ধরেন ড. কামরুন নাহাত শীলা। তিনি জানান, নাহিদা বেগম চান, আগের কোনো ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছিল কি না, পুলিশ তা তদন্ত করে দেখুক।

২২ ঘণ্টা পর উদ্ধার হয় মরদেহ

শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর অপ্রতিমের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার বেলা ১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

এখন অপ্রতিমের হত্যার পেছনে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা, পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধ, নাকি অতীতের কোনো ঘটনার প্রতিশোধ—এসব সম্ভাবনাই গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।