দীর্ঘ ক্যারিয়ারে একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে সাফল্য পেয়েছেন বলিউড অভিনেতা আমির খান। তবে পেশাগত ব্যস্ততা ও কাজের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে গিয়ে জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পরিবারকে সময় দিতে পারেননি তিনি। তিন দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকিয়ে সেই আক্ষেপের কথাই জানালেন অভিনেতা। নিজের উপলব্ধির কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে কেঁদেও ফেলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের ক্যারিয়ারের নানা অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময় নিয়ে কথা বলেন আমির খান। এ আয়োজনে তাকে দেওয়া হয় ‘স্ক্রিন আইকন অ্যাওয়ার্ড’।
অনুষ্ঠানে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলো সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে আমির জানান, কাজের পেছনে ছুটতে গিয়ে পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারার বিষয়টি তাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে।
অভিনেতা বলেন, করোনাভাইরাস মহামারির সময় নিজের জীবন নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার সুযোগ পান তিনি। তখন উপলব্ধি করেন, কাজ করতে করতেই জীবনের অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। এই ব্যস্ততার মধ্যে সন্তানদের বড় হয়ে ওঠা এবং পরিবারের সঙ্গে কাটানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোও অনেক ক্ষেত্রে মিস করেছেন তিনি।
আমিরের ভাষায়, এভাবে ৩০ বছর কেটে গেলে অনেক সম্পর্কই দূরে সরে যেতে পারে। সন্তানরা বড় হয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যায়। তখন তার মনে হয়েছে, জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে তিনি নিজেকে বঞ্চিত করেছেন।
নিজের এই উপলব্ধির কথা বলতে গিয়ে আবেগ সামলাতে পারেননি অভিনেতা। একপর্যায়ে চোখের পানি মুছে উপস্থিত দর্শকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। এ সময় দর্শকেরা করতালি দিয়ে তাকে সমর্থন জানান।
আমির জানান, এই উপলব্ধির পর জীবনের অগ্রাধিকারে পরিবর্তন এনেছেন তিনি। গত চার বছর ধরে পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের জন্য বেশি সময় রাখার চেষ্টা করছেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৫৬ বছর বয়সে জীবনের এই সত্য উপলব্ধি করতে পেরে তিনি কৃতজ্ঞ। ৮৬ বছর বয়সে এমন উপলব্ধি হলে হয়তো অনেক কিছু করার জন্য সময় পাওয়া যেত না।
ক্যারিয়ারের শুরুতেও কঠিন সময় পার করেছেন আমির
অনুষ্ঠানে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের কঠিন সময়ের কথাও স্মরণ করেন আমির খান। ১৯৮৮ সালে কেয়ামত সে কেয়ামত তাক সিনেমার সাফল্যের পর মাত্র ছয় মাসের মধ্যে নয়টি সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। পরে বুঝতে পারেন, একসঙ্গে অনেকগুলো সিনেমার দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছেন।
এরপর তার অভিনীত একের পর এক সিনেমা বক্স অফিসে ব্যর্থ হতে শুরু করে। আমির জানান, সেই সময় বাড়ি ফিরে কাঁদতেন এবং তৎকালীন স্ত্রী রিনা দত্তের সঙ্গে নিজের কষ্টের কথা ভাগ করে নিতেন।
পরপর সিনেমা ব্যর্থ হওয়ায় তাকে ‘ওয়ান-ফিল্ম ওয়ান্ডার’—অর্থাৎ একটি সিনেমার সাফল্যের সুবাদে পরিচিতি পাওয়া অভিনেতা হিসেবেও আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।
সেই সময়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আমির বলেন, মানসিক ও আবেগের দিক থেকে তার মনে হতো, তিনি যেন চোরাবালিতে আটকে গেছেন। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার যত চেষ্টা করতেন, ততই আরও গভীরে ডুবে যাচ্ছিলেন।
‘থ্রি ইডিয়টস’-এর সিক্যুয়েল নিয়ে যা জানালেন
এদিকে বহুল আলোচিত থ্রি ইডিয়টস সিনেমার সিক্যুয়েল নিয়েও কথা বলেছেন আমির খান। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া রাজকুমার হিরানি পরিচালিত এ সিনেমায় তার সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন আর মাধবন, শারমান জোশি ও কারিনা কাপুর খান।
আমির জানান, সিনেমাটির চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করছেন পরিচালক রাজকুমার হিরানি। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশে ফেরার পর পরিচালকের কাছ থেকে চিত্রনাট্যের চূড়ান্ত সংস্করণ শোনার আশা করছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে আমির বলেন, রাজকুমার হিরানি চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করছেন। তিনি আশা করছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশে ফিরলে পরিচালক তাকে চূড়ান্ত চিত্রনাট্য শোনাবেন। আপাতত ভালো কিছুর প্রত্যাশা করছেন তিনি।
সিঙ্গাপুর চলচ্চিত্র উৎসবে সম্মাননা
সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘স্ক্রিন আইকন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন আমির খান। হংকংভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাতা পিটার চ্যান হো-সান তার হাতে এ সম্মাননা তুলে দেন।
পুরস্কার গ্রহণের পর আমির বলেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ একটি সম্মিলিত শিল্পমাধ্যম। এখানে অনেক মানুষ একে অন্যের কাজে অবদান রাখেন। পিটার চ্যানের হাত থেকে সম্মাননা পাওয়ায় পুরস্কারটি তার কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে বলেও জানান তিনি।
এর আগে ২০১৭ সালে সিক্রেট সুপারস্টার সিনেমা নিয়ে এ উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন আমির। এবারের উৎসবে তার প্রযোজিত ও অভিনীত ২০০১ সালের সিনেমা লাগান-এর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়েছে।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সাফল্য ও ব্যর্থতা—দুইয়েরই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন আমির খান। তবে সিঙ্গাপুরের এ আয়োজনে তার বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে ব্যক্তিগত জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি—কাজের পাশাপাশি পরিবার ও প্রিয়জনদের সময় দেওয়াও সমান জরুরি।



