কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে এক রাতেই সাতটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। সংস্থাটির দাবি, হামলায় চারটি ট্যাংকারে আগুন ধরে যায় এবং মাইনের আঘাতে আরও তিনটি ট্যাংকার অচল হয়ে পড়ে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালীতে এক দিনে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার এটিই সবচেয়ে বড় ঘটনা।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, গভীর রাতে তেল পরিবহনের সময় চারটি ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এতে জাহাজগুলোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া মাইনের আঘাতে আরও তিনটি ট্যাংকার চলাচলের সক্ষমতা হারায়।
তবে হামলায় হতাহতের সংখ্যা, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর পতাকা ও জাতীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানায়নি ইরান।
মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার হুঁশিয়ারি
হামলার দাবি জানানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসি। সংস্থাটির সংবাদমাধ্যম ‘সেপাহ নিউজ’-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালীর অন্য অংশে ট্যাংকার চলাচলে সহায়তা বা নিরাপত্তা দিতে এগিয়ে আসে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানো হতে পারে।
বিবৃতিতে বলা হয়, মার্কিন সামরিক বাহিনীকে বুঝতে হবে, এ ধরনের পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে সংঘাত আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এটিকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছে আইআরজিসি।
বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য এই নৌপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রণালীটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি করে আসছে ইরান। অন্যদিকে, এ পথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রও তৎপরতা বাড়িয়েছে।
তেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে ইরান: ট্রাম্প
এদিকে বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর চেষ্টা করছে ইরান।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান কথিত হামলা ও মাইনসংক্রান্ত ঘটনা নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালাচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আরও বেশি তেল পরিবাহিত হচ্ছে।
মাইন হামলার দাবি অস্বীকার যুক্তরাষ্ট্রের
অন্যদিকে, আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) এক মুখপাত্র ইরানের মাইন হামলার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মার্কিন ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ থেকে ইতিমধ্যে মাইন অপসারণ করেছে মার্কিন বাহিনী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান মূলত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে।
মার্কিন মুখপাত্র আরও দাবি করেন, হরমুজ প্রণালী এখনো সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রয়েছে এবং প্রায় ৯৫ শতাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচল করছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ইরান সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ হারাচ্ছে। ধারাবাহিক হামলাগুলো সেই পরিস্থিতিরই প্রতিফলন।
তবে হামলার সংখ্যা, মাইন ব্যবহারের অভিযোগ এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যে স্পষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে কী প্রভাব ফেলে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



