সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে একের পর এক বিদেশ সফরে যাচ্ছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। যদিও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ঠিকাদার, সরবরাহকারী বা উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের অর্থে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবেন না—তবুও এই নির্দেশনা বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন নয়, বরং এটি স্বার্থের সংঘাত ও অনৈতিকতার উদাহরণ।
চীন সফর—টয়লেট প্রশিক্ষণ!
স্থানীয় সরকার বিভাগের তিন কর্মকর্তা—মো. ফারুক হোসেন, মো. নুরুজ্জামান ও মো. জাকির হোসেন—চীনে যাচ্ছেন পাঁচটি মোবাইল টয়লেট ব্যবস্থাপনা শেখার প্রশিক্ষণে। তাদের সব ব্যয় বহন করবে টয়লেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান শ্যাংডং কিউয়ানবাই ইন্টেলিজেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড। অথচ ঠিক এই ধরনের ভ্রমণ পরিহারের জন্যই ছিল প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা।
পুনরাবৃত্ত বিদেশ সফর
একইভাবে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তারা যানবাহন, স্যানিটেশন সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ নানা প্রকল্পের “প্রশিক্ষণ” বা “ফ্যাক্টরি টেস্ট” এর অজুহাতে বিদেশে যাচ্ছেন।
- ১২ আগস্ট জারি এক জিওতে তিনজন কর্মকর্তা—রবিউল ইসলাম, মমতাজুর রহমান ও শাহিদা কানিজ—বিদেশ যান স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণে। ব্যয় বহন করে টেক-স্ট্রেইট এনার্জি সার্ভিসেস।
- ৯ সেপ্টেম্বর আরও পাঁচজন কর্মকর্তা জাপান সফরের অনুমোদন পান, খরচ দেয় অ্যাডভান্সড টেকনোলজি কনসোর্টিয়াম লিমিটেড। প্রশিক্ষণের বিষয় অনির্দিষ্ট।
- ১৪ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ড সফর অনুমোদন পান স্থানীয় সরকার বিভাগের ও ডিএসসিসির তিনজন কর্মকর্তা। ব্যয় দেয় ইন্টারন্যাশনাল সেলস অ্যান্ড ট্রাকস এশিয়া।
- একইভাবে চীনে চেইন ডোজার ব্যবহারের প্রশিক্ষণ, ফ্রান্সে ক্র্যাপার ব্রিজ টেস্ট, ও চীনে বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিকল্পনার প্রশিক্ষণ—সবই ঠিকাদার বা উৎপাদকদের অর্থে।
নিয়ম না মানার প্রবণতা
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর ও চলতি বছরের ২৩ মার্চ জারি হওয়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে:
- ঠিকাদার/সরবরাহকারীর অর্থে বিদেশ ভ্রমণ নিষিদ্ধ
- স্ত্রী/স্বামী/সন্তানকে সফরসঙ্গী করা যাবে না
- শুধুমাত্র অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থে বিদেশ যাওয়া যাবে
তারপরও প্রায় সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে বারবার এই নির্দেশ উপেক্ষা করে ভ্রমণের জিও জারি করা হচ্ছে।
সরাসরি অনিয়মের উদাহরণ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য বেলাল হোসেন চৌধুরী প্রশিক্ষণের জন্য ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার অনুমোদন নিয়ে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চলমান। আর এ ভ্রমণের ব্যয় বহন করেছে স্টার টেক অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড।
বিশেষজ্ঞদের মত
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সরকারের ব্যয়সংকোচনের নির্দেশ সত্ত্বেও এসব ভ্রমণ সরকারি শৃঙ্খলা ভাঙার দৃষ্টান্ত। ঠিকাদারদের অর্থে ভ্রমণ কখনোই ‘বিনামূল্যের সুবিধা’ নয়, বরং তা প্রকল্প ব্যয়ে সংযুক্ত থাকে। এটি এক ধরনের অপ্রকাশ্য লেনদেন।”
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইঞা বলেন, “প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা না মানা চাকরিবিধির পরিপন্থী।”
প্রশ্ন থেকেই যায়
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া মেলেনি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ বলেন, “আমি এ বিষয়ে অবগত নই। তবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে যারা নিয়োজিত, তাদের নিয়ম মেনেই চলা উচিত।”



