বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় জাপান বরাবরই একটি বিশ্বস্ত বন্ধু ও গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার। স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর অন্যতম জাপান দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে এ দেশের অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। সেই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর ’২৬ পর্যন্ত চার দিনের এ সফর কেবল আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না; বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে অবস্থান শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের জাপান সফরকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক, যৌথ ঘোষণা, বিভিন্ন সহযোগিতা চুক্তি, বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে সমঝোতা—সব মিলিয়ে সফরটি বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
সম্পর্ক উন্নয়নে নতুন অধ্যায়
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক হচ্ছে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কৌশলগত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় উন্নীত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। বিশেষ করে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ-বি উদ্যোগকে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ নামে নতুন কৌশলগত কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এর মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশকে রাখার বিষয়টি আমাদের জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক—উভয় দিক থেকেই ইতিবাচক।
বিগ-বি উদ্যোগের চারটি প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ, এটি শুধু অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নয়; বরং একটি সমন্বিত আঞ্চলিক উন্নয়নদর্শন।
এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ
সফরের সবচেয়ে আলোচিত অর্জনগুলোর একটি হচ্ছে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের ঘোষণা। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ বিপুল। জাপান ও বাংলাদেশের যৌথ ঘোষণায় এ বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা। বিশেষ করে যখন বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন শিল্প স্থাপন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি আমাদের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ, তখন জাপানের এ আগ্রহকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো জরুরি।
জাপানি বিনিয়োগের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা, উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মানের ক্ষেত্রে। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার জন্য পরিচিত। ফলে বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ বাড়লে শুধু মূলধন আসবে না, পাশাপাশি প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এখানে উল্লেখযোগ্য, জাপানি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের সম্ভাব্য এক ট্রিলিয়ন ইয়েন এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন বা জেটরোর মাধ্যমে দুই দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ১৭টি সমঝোতা স্মারক থেকে সৃষ্ট সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ এক বিষয় নয়। সফরসংশ্লিষ্ট বক্তব্যে ১৭টি সমঝোতার মাধ্যমে প্রায় ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথাও এসেছে। এগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পে রূপ দিতে পারলে বাংলাদেশের শিল্পায়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।
অবকাঠামো উন্নয়ন
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে আধুনিক ও সমন্বিত অবকাঠামো। এ ক্ষেত্রে জাপানের সহযোগিতা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে শিল্প, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার বিষয়ে দুই দেশের নেতাদের ঐকমত্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের একটি বড় সম্পদ। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সে সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন গভীর সমুদ্রবন্দর, উন্নত সড়ক ও রেল যোগাযোগ, আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ।
মাতারবাড়ীকে ঘিরে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়বে, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও ইতিবাচক। পাশাপাশি মেট্রোরেল নির্মাণে গতি আনা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যৎ সহযোগিতার আলোচনা বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের জন্য আশাব্যঞ্জক।
প্রধানমন্ত্রী জাপানের আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের ছয়টি বিভাগীয় শহরের মধ্যে দ্রুতগতির রেল যোগাযোগ এবং দেশব্যাপী উড়ালসড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনায় সহযোগিতা চেয়েছেন। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও রপ্তানির সুযোগ
বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট বা ইপিএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। দুই দেশের মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষর এবং দ্রুত কার্যকর করার বিষয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের অঙ্গীকার বাংলাদেশের জন্য নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের জন্য এ চুক্তির গুরুত্ব বহুমাত্রিক। একদিকে জাপানের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এ ধরনের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সহায়ক হতে পারে। এ ছাড়া আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বা আরসিইপিতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার আগ্রহ নিয়ে জাপানের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক বাণিজ্যব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে এটি ভবিষ্যতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষি, মৎস্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা
প্রধানমন্ত্রীর সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক হচ্ছে সহযোগিতার ক্ষেত্রকে প্রচলিত অবকাঠামো ও অর্থনীতির বাইরে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং দক্ষতা উন্নয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত করা। জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। এর ফলে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন এবং কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি খাতে জমির পরিমাণ সীমিত হলেও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। জাপানের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত বীজ, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে কৃষকের আয় বাড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানবিষয়ক সহযোগিতা বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং পেশাগত শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু শ্রমিক পাঠানো নয়, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে অধিক আয় নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন
প্রধানমন্ত্রী জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন এবং মহাকাশবিজ্ঞানকে সহযোগিতার অগ্রাধিকার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রতি আগ্রহ ক্রমবর্ধমান। এই জনশক্তিকে জাপানের প্রযুক্তি, গবেষণা ও বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশ শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে নয়, বরং প্রযুক্তিপণ্য ও সেবা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং জাপানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন। যৌথ গবেষণা, ইন্টার্নশিপ, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাওয়া যাবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু
বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নিরবচ্ছিন্ন, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ সময়োপযোগী। প্রধানমন্ত্রী জাপানি বিনিয়োগকারীদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। জাপানের ফুতসু শহরে এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনও এ সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সহযোগিতার জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি লেটার অব ইনটেন্ট স্বাক্ষর হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশকে উপকূলীয় সুরক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।
নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা
জাপানের কাছ থেকে উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য টহল জাহাজ সংগ্রহে ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত অনুদান সহায়তার চুক্তি হয়েছে। এটি বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল সামুদ্রিক সম্পদ, সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চল সুরক্ষিত রাখা আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া মিয়ানমারের রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য জাপানের সক্রিয় ভূমিকা বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। সফরকালে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দলিল ও চুক্তি, দুটি প্রকল্পে ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণসহায়তার প্রতিশ্রুতি এবং বেসরকারি খাতে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, বিনিয়োগের ঘোষণা, সমঝোতা স্মারক, ঋণের প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবে বিনিয়োগ বা প্রকল্প বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপান্তর করতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রথমত, জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য করনীতি, শুল্কব্যবস্থা, জমি বরাদ্দ, লাইসেন্স, অর্থ স্থানান্তর এবং আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, উন্নত যোগাযোগ এবং দক্ষ জনশক্তি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সমঝোতা স্মারকগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিশন বা কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। চতুর্থত, জাপানি বিনিয়োগ যেন শুধু আমদানি-নির্ভর শিল্প স্থাপনে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং স্থানীয় উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং দেশীয় সরবরাহব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, সে বিষয়েও নজর দিতে হবে। বিনিয়োগের সুফল যেন দেশের মানুষের কর্মসংস্থান, দক্ষতা, আয় ও জীবনমান উন্নয়নে প্রতিফলিত হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়ন করা যায়। এ সফরের মধ্য দিয়ে জাপানের সঙ্গে সম্পর্ককে ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে এই সুযোগকে বাস্তব উন্নয়নে রূপান্তর করা। এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা, দুই লাখ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা, মাতারবাড়ীকে ঘিরে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, কৃষি ও দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির সুফল—সবকিছুই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সাফল্য কেবল চুক্তির সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বিচার করতে হবে কতটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলো, কত মানুষের কর্মসংস্থান হলো, কতটা প্রযুক্তি স্থানান্তরিত হলো, রপ্তানি কতটা বাড়ল এবং সাধারণ মানুষ কতটা সুফল পেল—তার ভিত্তিতে।
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব দীর্ঘদিনের। এখন প্রয়োজন সেই বন্ধুত্বকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে পরিণত করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর সেই পথে একটি আশাব্যঞ্জক সূচনা। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ কূটনীতি, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এ সফরের অর্জন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য জাপানের সহযোগিতা যেন শুধু উন্নয়ন সহায়তায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং তা হয়ে উঠুক প্রযুক্তি, শিল্পায়ন, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব। এটাই হওয়া উচিত প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মানদণ্ড।
ম. হামিদুল হক মানিক, কার্যনির্বাহী সদস্য: বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)



