জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের খুলনা বিভাগমুখী লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কোনো নেতাকে দেখা যায়নি। তবে সমাবেশ শেষ হওয়ার পর লংমার্চের গাড়িবহরে দলটির চার নেতা যুক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন এনসিপির নেতারা।
সোমবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ৮টায় রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে খুলনার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে গাড়িবহর।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির একাধিক নেতা জানান, দলের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব এবারের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন না। তাঁদের পরিবর্তে দলীয় সিদ্ধান্তে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়েছে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ও আবদুল হান্নান মাসউদ এবং যুগ্ম সদস্যসচিব এস এম সাইফ মুস্তাফিজকে।
এনসিপির নেতারা জানান, এরই মধ্যে শরীয়তপুরের নাওডোবায় বক্তব্য দিয়েছেন আরিফুল ইসলাম আদীব। তাঁদের ভাষ্য, এবারের লংমার্চে দলটির অংশগ্রহণ থাকবে প্রতীকী পর্যায়ে। আগের দুটি লংমার্চে আহ্বায়ক, সদস্যসচিবসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকলেও এবার সীমিতসংখ্যক প্রতিনিধিকে পাঠানো হয়েছে।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, দল হিসেবে এনসিপি লংমার্চে অংশ নিচ্ছে এবং কয়েকজন প্রতিনিধি কর্মসূচিতে থাকছেন। তবে উদ্বোধনী সমাবেশে দলের কোনো নেতা না থাকার বিষয়ে তিনি সরাসরি মন্তব্য করেননি।
অন্যদিকে, ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ লংমার্চে থাকবেন। তিনি বাগেরহাট থেকে গাড়িবহরে যুক্ত হবেন।
তবে এনসিপির এক যুগ্ম আহ্বায়ক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, হাসনাত আবদুল্লাহ ইতিমধ্যে গাড়িবহরে রয়েছেন। যদিও এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
গোপালগঞ্জে গাড়িবহরের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা
খুলনামুখী লংমার্চের গাড়িবহর গোপালগঞ্জের ওপর দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে গোপালগঞ্জে এনসিপির জুলাই পদযাত্রা ও সমাবেশে হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ওই হামলার জন্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দায়ী করা হয়েছিল।
সেই ঘটনার প্রায় ১৫ মাস পর এবার বিরোধী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ লংমার্চ একই জেলার ওপর দিয়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। তবে ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে গোপালগঞ্জে কোনো পথসভা আয়োজনের পরিকল্পনা রাখা হয়নি।
লংমার্চে হামলার আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন ঐক্যের নেতারা। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এ ধরনের খবরকে অসত্য ও গুজব বলে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, গোপালগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা হয়েছে এবং সেখানে কোনো হামলার আশঙ্কা নেই।
পৃথক রাজনৈতিক পরিচয় বজায় রাখতে চায় এনসিপি
লংমার্চে এনসিপির অংশগ্রহণের ধরন নিয়ে কয়েক দিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছিল। দল-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের অংশ হলেও নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় অক্ষুণ্ন রাখতে চায় এনসিপি।
এ লক্ষ্যেই খুলনা বিভাগমুখী লংমার্চের আগের দিন, গত শুক্রবার, ঢাকার শাহবাগে পৃথক গণবিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে দলটি।
যেভাবে এগোবে লংমার্চ
সকালে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে আয়োজিত উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। বক্তব্যে তিনি বলেন, আরেকটি অনিবার্য বিপ্লব দরজায় কড়া নাড়ছে। এ জন্য দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্য শেষ হওয়ার পর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে যাত্রা শুরু করে লংমার্চের গাড়িবহর। হানিফ ফ্লাইওভার হয়ে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক ধরে ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, খুলনা, রূপসা সেতু পার হয়ে যশোর ও কুষ্টিয়ার দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বহরটির। প্রায় ৪২৫ কিলোমিটারের এ যাত্রায় ১৯টি জেলা অতিক্রম করা হবে। পথে একাধিক স্থানে পথসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের মধ্যবর্তী নাওডোবা দিয়ে খুলনা বিভাগের দিকে যাবে গাড়িবহর। পথে নাওডোবা, বাগেরহাটের কাটাখালী, খুলনার বাবরী চত্বর ও স্বাধীনতা চত্বর, যশোরের মুড়লি মোড় এবং ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পথসভা করার কথা রয়েছে। যাত্রার শেষ পর্যায়ে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
গণভোটের রায় কার্যকর এবং জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে এ লংমার্চের আয়োজন করেছে ১১-দলীয় ঐক্য। পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস ও সারের সংকট সমাধান এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের দাবিও জানাচ্ছে জোটটি।
এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ, দখলদারত্বের অবসান এবং প্রশাসনের সব স্তর থেকে দলীয়করণ দূর করার দাবিও রয়েছে তাদের কর্মসূচিতে।
এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করেছিল ১১-দলীয় ঐক্য। খুলনা বিভাগের কর্মসূচির পর আগামী ২১ নভেম্বর সিলেটের উদ্দেশে আরেকটি লংমার্চ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে জোটটির।



