কুড়িগ্রামের উলিপুরে ফেসবুকে পরিচয় হওয়া এক ব্যক্তির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক এবং তাঁকে ঘিরে সৃষ্ট সামাজিক বিরোধের পর নাজমা খাতুন (৪৪) নামে এক নারীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার পশ্চিম নাওড়া এলাকায় নিজ বাড়ির গোয়ালঘর থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে বিরোধ, বিয়ের আয়োজন ভেঙে যাওয়া এবং পরবর্তী সালিশের ঘটনায় সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার চাপ থেকে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। তবে আত্মহত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ তদন্তসাপেক্ষ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নাজমার স্বজনদের বরাতে জানা গেছে, ধামশ্রেণি ইউনিয়নের পশ্চিম নাওড়া এলাকার আব্দুল খালেকের স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ে নাজমার সঙ্গে প্রায় ছয় মাস আগে ফেসবুকে সাইদুর রহমান পলাশ নামে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তির প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই ব্যক্তি নিজেকে রেল পুলিশের সদস্য বলে পরিচয় দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন অজুহাতে তিনি নাজমার কাছ থেকে স্বর্ণালংকার ও ৩০ হাজার টাকা নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নাজমার সঙ্গে দেখা করতে পশ্চিম নাওড়া এলাকায় যান ওই ব্যক্তি। তাঁর উপস্থিতি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় স্থানীয়রা দুজনকে আটক করেন। পরে তাঁদের সম্মতিতে রাতেই বিয়ের আয়োজন করা হয়। তবে বিয়ের নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র চাওয়া হলে ওই ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। তখন জানা যায়, পলাশ নামে পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি আসলে পাশের পান্ডুল ইউনিয়নের খোঁচাবাড়ি এলাকার অমল চন্দ্রের ছেলে দুলাল চন্দ্র (৫৩)। স্থানীয়দের দাবি, তিনি নিজেকে মুসলিম পরিচয়ে উপস্থাপন করেছিলেন। পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পর বিয়ের আয়োজন বন্ধ হয়ে যায় এবং তাঁকে আটকে রাখা হয়।
ঘটনার পর ধামশ্রেণি ও পান্ডুল ইউনিয়নের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেন। রোববার ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় নাজমুল হক, মাহমুদুল হাসান সুজন ও গ্রামপুলিশ সৈয়দ আলীসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যাঁরা ওই দুজনকে আটক করেছিলেন, তাঁদের না জানিয়েই প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অভিযুক্ত যুবককে ছেড়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, পরিচয় গোপন করে সম্পর্ক গড়া ও বিয়ের আয়োজন ভেঙে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাজমা সামাজিকভাবে অপমানিত বোধ করছিলেন। এর পরই রোববার দুপুরে বাড়ির গোয়ালঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে তাঁদের দাবি। পরে পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
এ বিষয়ে ধামশ্রেণি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম জানান, শনিবার রাতে দুই পক্ষের স্বজনদের নিয়ে আলোচনায় তিনি এবং পান্ডুল বিএনপির নেতা জিয়াউল হক বাদলসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। ওই নারীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং উপস্থিত ব্যক্তিদের সামনে নাজমার স্বজনদের হাতে অর্থ তুলে দেওয়া হয়।
রোববার নাজমার আত্মহত্যার কারণ জানতে চাইলে সহিদুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। পান্ডুল ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউল হক বাদলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর নম্বর বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উলিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত আলী সরকার জানান, রোববার বিকেলে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় আনা হয়েছে। সোমবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুড়িগ্রাম মর্গে পাঠানোর কথা রয়েছে। নাজমার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলেও তিনি জানতে পেরেছেন। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান ওসি।



