মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাঁচ দিনের মধ্যে চতুর্থ দফা হামলার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ রোববার (১১ অক্টোবর) বিমানবন্দরের একটি টার্মিনালে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত হানলে আগুন ধরে যায়। এ নিয়ে ধারাবাহিক হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে। এসব হামলায় বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক হতাহত হয়েছেন। খবর রয়টার্স ও আল জাজিরার।
গত ৫ অক্টোবর হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান শুরুর পর থেকে রিয়াদ বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা বাড়তে থাকে। প্রথম হামলাটি হয় গত বুধবার (৭ অক্টোবর)। ওই ঘটনায় সুদানের এক নাগরিক নিহত হন। শুক্রবার দ্বিতীয় দফা হামলায় এক পাইলটসহ তিন সৌদি নাগরিক প্রাণ হারান।
তবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাটি হয় শনিবার (১০ অক্টোবর)। ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাংলাদেশিসহ ১৩ জন নিহত হন। আহত হন তিন শতাধিক মানুষ। আগের হামলাগুলোর প্রাণহানির সঙ্গে শনিবারের হতাহতের সংখ্যা যোগ করে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে।
রোববারও রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা
রোববার (১১ অক্টোবর) রিয়াদ বিমানবন্দরের ৪ নম্বর টার্মিনালে একটি অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। এতে আগুন ধরে যায় এবং কয়েকজন আহত হন। এ ছাড়া বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে সৌদি আরবের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।
একই দিন দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণের পাশাপাশি বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিমানবন্দর এলাকায় সাইরেন বাজতে এবং যাত্রীদের ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়।
শনিবারের হামলায় বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিহত
শনিবারের হামলাটি গত মার্চে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনায় নিহত ১৩ জনের মধ্যে চারজন সৌদি আরবের নাগরিক, দুজন বাংলাদেশি, একজন ফিলিস্তিনি, একজন মার্কিন, একজন মিসরীয়, একজন জর্ডানি, একজন সিরীয় ও একজন সুদানি নাগরিক রয়েছেন।
নিহত মিসরীয় নারী আজ্জা রামজি (২৮) সৌদি এয়ারলাইনস ফ্লাইনাসের ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ছিলেন বলে জানিয়েছে মিসরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন।
নিহত সিরীয় নারী বুসাইনা আহমেদ ওয়াইদার (৫৬) পাঁচ বছর ধরে সৌদি আরবে বসবাস করছিলেন। তিনি মক্কায় থাকতেন। রিয়াদে বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে ফেরার পথে হামলার শিকার হন তিনি।
এদিকে ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, শনিবারের হামলায় আহত তাদের এক নাগরিক রোববার মারা গেছেন। হামলার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দর বন্ধ রাখার সময়সীমা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত স্কুলগুলোতে অনলাইন পাঠদান চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
হুথিদের হুঁশিয়ারি, সৌদির ‘কড়া জবাব’
রিয়াদ ও দাম্মামের বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করেছে হুথিরা। সৌদি আরবের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের ভাষ্য, ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি এখনও বাকি আছে।’
হুথিরা এয়ারলাইনস, যাত্রী ও বিমানবন্দরের কর্মীদের সৌদি আরবের বিমানবন্দর এবং আকাশসীমা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সংগঠনটি দাবি করেছে, সৌদি বিমানবন্দরগুলো এখন হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং সেগুলো তাদের সামরিক অভিযানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে হুথিদের অভিযোগ, রোববার সৌদি আরব ইয়েমেনের রাজধানী সানায় তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিমানবন্দরে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ওই হামলায় একটি বাড়িতে আঘাত লাগলে এক শিশু নিহত ও ছয়জন আহত হন বলে দাবি করেছে তারা।
এদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, এসব হামলার ‘কড়া জবাব’ দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও সামরিক সহায়তার তৎপরতা
রিয়াদ বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় ইয়েমেন যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্রিটিশ দূতাবাস জেদ্দা ও দাম্মামে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় সব বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার বিষয়েও সতর্ক করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’ শনিবার রাতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে এ নিয়ে তাঁর কথা বলার কথা রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২০০ মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা সৌদি আরবে অবস্থান করছেন।
এদিকে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লায়েন।
তেলের বাজারে সম্ভাব্য অস্থিরতার আশঙ্কার মধ্যে সোমবার সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক এক যৌথ বিবৃতিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যও সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
এ ছাড়া ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসায় সৌদি আরব ফ্রান্স, মিসর, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানের কাছে আরও সহায়তা চেয়েছে বলে জানা গেছে। ধারাবাহিক হামলা, পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনায় উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।



