সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রয়োজন হলেও সাইবার নিরাপত্তার অজুহাতে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংকুচিত করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
সরকারের প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়ায় কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও কয়েকটি অস্পষ্ট ও অতিবিস্তৃত বিধান নতুন করে মানবাধিকার উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা জানায় এইচআরএসএস। সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, সাইবার নিরাপত্তা আইন নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার মাধ্যম হওয়া উচিত, মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার নয়।
এইচআরএসএসের দাবি, খসড়াটি বর্তমান রূপে চূড়ান্ত হলে সাইবার অপরাধ দমনের পাশাপাশি মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ, সাংবাদিক হয়রানি ও ভিন্নমত দমনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি কিংবা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার ‘আশঙ্কা’র মতো বিস্তৃত শব্দের ব্যবহার মামলা ও গ্রেপ্তারের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলেও সংগঠনটি মনে করছে।
সংগঠনটির মতে, প্রস্তাবিত সংশোধনী সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ, ন্যায়বিচারের নীতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
গুজব ও অপতথ্য নিয়ে উদ্বেগ
প্রস্তাবিত গুজব ও অপতথ্যবিষয়ক বিধান নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে এইচআরএসএস। সংগঠনটির ভাষ্য, ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনের কিছু অস্পষ্ট ও ব্যাপক ক্ষমতাসম্পন্ন ধারা অতীতে সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী, মানবাধিকারকর্মীসহ সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
নতুন খসড়ায় গুজব ও অপতথ্য প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। এইচআরএসএস বলছে, ‘অযাচাইকৃত’, ‘মিথ্যা’, ‘বিকৃত’ বা ‘বিভ্রান্তিকর’ তথ্যের সংজ্ঞা ও প্রয়োগের সীমা স্পষ্ট না হলে সাংবাদিকতা এবং মানবাধিকার পর্যবেক্ষণের কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যঙ্গ-কার্টুন ও শেয়ার করা কনটেন্ট নিয়েও আপত্তি
নারী ও শিশু সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত ধারায় মানহানি, হেয়প্রতিপন্নকরণ ও বুলিং যুক্ত করার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, রাজনৈতিক সমালোচনা, ব্যঙ্গ, কার্টুন, প্রতিবাদী বক্তব্য বা সামাজিক বিতর্ককে ‘হেয়প্রতিপন্ন’ হিসেবে বিবেচনা করে ফৌজদারি মামলা করার সুযোগ তৈরি হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ ছাড়া কোনো কনটেন্ট শেয়ার করাকেও প্রচার হিসেবে গণ্য এবং সহায়তার শাস্তি মূল অপরাধের সমান করার প্রস্তাব নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে এইচআরএসএস। সংগঠনটি বলছে, এতে নতুন ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
প্যারোডি, কার্টুন, ব্যঙ্গ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কনটেন্টের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জ্ঞান এবং সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে পৃথক দায় নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে তারা।
কনটেন্ট ব্লকে বিচারিক অনুমোদনের দাবি
কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষেত্রে বিচারিক অনুমোদন এবং স্বাধীন আদালত বা ট্রাইব্যুনালে আপিলের সুযোগ রাখার দাবি জানিয়েছে এইচআরএসএস। একই সঙ্গে কোনো কোম্পানির নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিলের মতো প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত কারণ দর্শানো, নোটিশ প্রদান এবং স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে সংগঠনটি।
সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের গঠন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এইচআরএসএস। কাউন্সিলকে স্বাধীন, বহুপক্ষীয় ও দলনিরপেক্ষ করার পাশাপাশি সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, প্রযুক্তিবিদ ও শিক্ষাবিদদের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
৯ দফা দাবি এইচআরএসএসের
বিবৃতিতে ৯ দফা দাবি তুলে ধরে এইচআরএসএস বলেছে, গুজব ও অপতথ্যবিষয়ক ধারা পুনর্বিবেচনা বা প্রত্যাহার, অস্পষ্ট শব্দের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ, সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থভিত্তিক মতপ্রকাশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া বেআইনি গ্রেপ্তার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ এবং আইন চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে অর্থবহ পরামর্শেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।



