ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনির অবস্থান শনাক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে বলে দাবি করেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টাইমস। তবে তাকে আড়ালে রাখতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নানা কৌশল গ্রহণ করেছে তেহরান বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্য টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মোজতবা খামেনি মোবাইল ফোন কিংবা কম্পিউটার ব্যবহার করছেন না। তিনি একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তার মতো দেখতে একাধিক ব্যক্তিকেও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তার বাবা নিহত হওয়ার পর থেকে মোজতবা আর জনসমক্ষে দেখা দেননি। ওই হামলায় তিনিও আহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। এরপর থেকে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে এসেছে। কোনো সূত্র বলছে তিনি নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সুস্থ আছেন, আবার অন্য সূত্রের দাবি তিনি গুরুতর আহত হয়ে কার্যত অক্ষম।
দ্য টাইমসের ভাষ্য, মোজতবার দীর্ঘ নীরবতাই তাকে শনাক্ত করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা উপগ্রহের নজর এড়াতে তিনি দিনের বেলায় বাঙ্কার থেকে বের হন না।
প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়, তার বাবাকে শনাক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিভিন্ন সাইবার কৌশল ব্যবহার করেছিল। তেহরানের ট্রাফিক ক্যামেরা হ্যাক করে দেহরক্ষী ও সহযোগীদের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলা পরিচালিত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মোজতবার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি কার্যকর হচ্ছে না বলেও দাবি করেছে দ্য টাইমস। ফলে সিআইএ ও মোসাদ এখন মূলত মানব গোয়েন্দা তথ্য (হিউমিন্ট)—অর্থাৎ ইরানের অভ্যন্তরের তথ্যদাতা ও গুপ্তচর নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়, গোয়েন্দা মহলের একটি অংশের ধারণা, মোজতবা হয়তো ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় নিহত হয়েছেন অথবা পরে আঘাতের কারণে মারা গেছেন। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তাই তিনি জীবিত আছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
দ্য টাইমসের দাবি, মোজতবা জীবিত থাকলে তিনি তেহরানের কোনো ভূগর্ভস্থ স্থাপনা অথবা রাজধানী থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে কোম শহরের কাছে একটি সামরিক বাঙ্কারে অবস্থান করতে পারেন।
মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা রামি ইগ্রা দ্য টাইমসকে বলেন, মোজতবা ফোন ব্যবহার না করলেও অন্য উপায়ে যোগাযোগ করছেন। তার মতে, লিখিত বার্তা বা বার্তাবাহকের মাধ্যমে যোগাযোগ হতে পারে এবং তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হলে সেটি মানব গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমেই হবে। তিনি আরও বলেন, আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে শেষ পর্যন্ত তার এক বার্তাবাহককে অনুসরণ করেই খুঁজে পেয়েছিল সিআইএ। মোজতবার ক্ষেত্রেও তার ঘনিষ্ঠ কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
মোসাদের সাবেক আরেক কর্মকর্তা আভনার আব্রাহামও দাবি করেছেন, মোজতবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তার মতো দেখতে একাধিক ব্যক্তিকে ব্যবহার করছে ইরান। এদিকে, বাবার জানাজা ও দাফানে তার অনুপস্থিতি নিয়েও নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। তার নামে লিখিত বার্তা প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অডিও বা ভিডিও বার্তা প্রকাশ করা হয়নি।
দ্য টাইমসের উদ্ধৃতিতে এক সাবেক মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের মানব গোয়েন্দা সক্ষমতা সীমিত। তার মতে, এ ক্ষেত্রে ইসরায়েলের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর।
তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত এসব তথ্য ও দাবির বিষয়ে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।



