ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। টানা ষষ্ঠ রাতের হামলার পর তেহরান অভিযোগ করেছে, ওয়াশিংটন পরিকল্পিতভাবে দেশটির বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, সর্বশেষ হামলায় একটি রেলস্টেশন ও আবাসিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে সেতু, পানি শোধনাগার, খাদ্যগুদাম (সাইলো) এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের জ্বালানি খাতকে লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, “জ্বালানির উৎসগুলোকে আমি শেষের জন্য জমিয়ে রাখছি।” এই বক্তব্যের পর থেকেই হামলার তীব্রতা বাড়তে শুরু করেছে।
পাল্টাপাল্টি হামলায় বাড়ছে উত্তেজনা
উত্তেজনার মধ্যেই শুক্রবার ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা বাহরাইনে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা হচ্ছে।
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানজুড়ে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফের সংঘাত
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাতের সূচনা হয়। পরে জুন মাসে যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ ও নতুন আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হলেও, অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সমঝোতা ভেঙে আবারও পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু হয়। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে।
হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন সংকট
স্ট্রেইট অব হরমুজ বা হরমুজ প্রণালী নিয়েও উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। ওমান নতুন একটি নৌ-পরিবহন করিডোর ঘোষণা করার পর ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, প্রয়োজন হলে তারা এই কৌশলগত জলপথে নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেবে।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় চলাচলকারী জাহাজের ওপর নৌ-অবরোধ পুনর্বহালের ঘোষণা দিয়েছে।
স্থল অভিযানের প্রস্তুতি?
বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার মাত্রা বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সেতু ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে শুধু সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করাই নয়, সম্ভাব্য স্থল অভিযানের পথও প্রস্তুত করা হতে পারে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং এই সংঘাত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে কি না—তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
দক্ষিণ ইরানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি
দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশ ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করেছে তেহরান। আহভাজ, কেশম, বুশেহর, দশ্তি, বোস্তান, সিরিক ও বন্দর-এ লেঙ্গেহ এলাকায় বড় ধরনের বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের দাবি, আগের হামলাগুলোর তুলনায় এবার অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বন্দর আব্বাস
হরমুজ প্রণালীর তীরে অবস্থিত ইরানের প্রধান নৌঘাঁটি বন্দর আব্বাস সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির গণমাধ্যম।
তাদের তথ্যমতে, কাহুরেস্তান সেতু ও একটি আবাসিক এলাকায় হামলায় দুইজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, একটি যোগাযোগ টাওয়ার ধ্বংস হওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়া বন্দর আব্বাসের সঙ্গে সংযোগকারী প্রধান ছয়টি সেতু ধ্বংস হয়েছে বলে প্রাদেশিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিমানবন্দর, হাসপাতাল ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও হামলা
দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের ইরানশহর বিমানবন্দর এবং সেমনান বেসামরিক বিমানবন্দরের মূল ভবনও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
পশ্চিম ইলাম প্রদেশের দেহলোরানে একটি বোতলজাত পানির কারখানা এবং মারকাজি প্রদেশের খন্দাবের ভারী পানি উৎপাদন কেন্দ্রের আশপাশেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
আহভাজের বাঘাই স্পেশালাইজড হাসপাতালে হামলার পর সেখান থেকে প্রায় ২০০ রোগীকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে হাসপাতালে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এসব হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়েছেন। টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বেসামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন এবং জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অন্যদিকে হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল জোয়েল রেবার্ন আল জাজিরাকে বলেন, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এসব স্থাপনাকে ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য’ (সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহৃত) হিসেবে বিবেচনা করে হামলার অনুমোদন দিয়ে থাকতে পারে।
হতাহতের হিসাব
ইরানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ জুন পর্যন্ত যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে ৩ হাজার ৪৬৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
এছাড়া ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের বৈঠকের পর যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে আরও ৩৮ জন নিহত এবং ৪০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে তেহরান।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বন্দর আব্বাস ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্র। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল একসময় হরমুজ প্রণালী দিয়েই রপ্তানি হতো।
কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মার্ক হিলবোর্নের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ইরানের সামরিক রসদ সরবরাহ ব্যাহত করা এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো। এ কারণে সেতু, বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দিয়ে হামলা চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে উত্তর-পূর্ব ইরানের একটি সেতুও রয়েছে, যা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য করিডোরের অংশ।
অন্যদিকে ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাইমন মাবন সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বাইরে বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা বাড়লে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে এতে ইরানের জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে—এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই; বরং ওয়াশিংটনের প্রতি জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা



