tanaka

ভরিতে সোনার দাম বাড়লো ২১৫৮ টাকা

দেশের বাজারে সোনার গহনার দাম বাড়ানো হয়েছে। সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) সোনার গহনার দাম বাড়ানো হয়েছে...
প্রচ্ছদখেলাযুক্তরাষ্ট্র থেকে ইরান ফিরছে মাথা উঁচু করে

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইরান ফিরছে মাথা উঁচু করে

‘যদি কোনো কিছুকে তুমি পুরো হৃদয় দিয়ে চাও, তবে পুরো মহাবিশ্ব সেটি তোমার করে দিতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়’— ব্রাজিলীয় সাহিত্যিক পাউলো কোয়েলহোর আলকেমিস্ট উপন্যাসের এই বিখ্যাত উক্তি যেন এবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে ইরানকে। কারণ তারাও তো স্বপ্ন দেখেছিল, ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেন মহাবিশ্ব তাদের স্বপ্ন পূরণে নয়, বরং ভেঙে দিতে একজোট হয়েছিল।

ইরানের আক্ষেপ থাকতেই পারে—স্বপ্ন কি এভাবেও ভেঙে যায়? একবার নয়, বারবার! সমীকরণ ছিল সহজ। শেষ ম্যাচে মিশরকে হারাতে পারলেই নিশ্চিত হতো শেষ ৩২-এ জায়গা। সঙ্গে রচিত হতো নতুন ইতিহাস।

যোগ করা সময়ে খালিলজাদেহ বল জালে জড়াতেই উৎসবে মেতে উঠেছিল ইরান শিবির। সিয়াটল থেকে তেহরান—সবখানেই শুরু হয়েছিল উল্লাস। কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক মুহূর্ত। ভিএআরের হস্তক্ষেপে গোল বাতিল। কারণ অফসাইড।

ঘটনাটি ছিল অফসাইড আইনের একটি বিরল উদাহরণ। অনেকের ধারণা, সামনে একজন ডিফেন্ডার থাকলেই অফসাইড হয় না। বাস্তবে নিয়মটি ভিন্ন। গোলকিপারসহ প্রতিপক্ষের অন্তত দুইজন খেলোয়াড়ের পেছনে থাকতে হয় আক্রমণভাগের ফুটবলারকে। ওই মুহূর্তে গোলকিপার সামনে না থাকায় প্রয়োজনীয় দুইজন প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের পেছনে ছিলেন না খালিলজাদেহ। ফলে নিয়ম অনুযায়ী গোলটি বাতিল হয়।

সেই এক সিদ্ধান্তই বদলে দেয় ইরানের ভাগ্য। এরপর নকআউটে ওঠার জন্য তাদের তাকিয়ে থাকতে হয় অন্য দলগুলোর ফলাফলের দিকে।

প্রথমে আশা ছিল ক্রোয়েশিয়ার হার। কিন্তু তারা প্রত্যাশামতোই জয় পায়। এরপর উজবেকিস্তান ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে এগিয়ে গেলে নতুন আশার আলো জ্বলে। তবে কঙ্গো ঘুরে দাঁড়িয়ে তিন গোল করে নিশ্চিত করে শেষ ৩২-এ নিজেদের জায়গা।

সবশেষ ভরসা ছিল অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়া ম্যাচ। দুই দলের যেকোনো একটির হার ইরানের জন্য খুলে দিতে পারত নকআউটের দরজা।

মার্কো আর্নাতোভিচের গোলে অস্ট্রিয়া এগিয়ে গেলে নতুন করে আশাবাদী হয় ইরান। কিন্তু রাফিক বেলঘালি সমতা ফেরান। পরে মার্সেল সাবিতজারের গোলে আবার এগিয়ে যায় অস্ট্রিয়া, যদিও পাঁচ মিনিটের মধ্যেই রিয়াদ মাহরেজ ম্যাচ সমতায় ফেরান।

নাটকীয়তা চরমে ওঠে যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে। মাহরেজের দ্বিতীয় গোলে এগিয়ে যায় আলজেরিয়া। নির্ধারিত অতিরিক্ত সময় ছিল পাঁচ মিনিট। মনে হচ্ছিল, এবার হয়তো ইরানের অপেক্ষার অবসান ঘটবে।

কিন্তু ফুটবল যে শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত অনিশ্চয়তার খেলা। ৯৬তম মিনিটে সাশা কালাইজিচের গোল অস্ট্রিয়াকে সমতা এনে দেয়। ফলাফল—অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া, দুই দলই নকআউটে। আর হাতছানি দেওয়া ইতিহাস শেষ মুহূর্তে অধরাই থেকে যায় ইরানের জন্য।

তবু এই বিশ্বকাপে ইরানের অর্জন খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম ও মিশরের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তিন ম্যাচ খেলেও একটিতেও হারেনি তারা। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এই তিনটি ড্র অনেকটাই জয়ের সমান।

কারণ মাঠের লড়াইয়ের বাইরে আরও কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে ইরানকে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে দলের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ভিসা পাননি। খেলোয়াড়দেরও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের অনুমতি মেলেনি। ফলে প্রতিটি ম্যাচ খেলতে হয়েছে মেক্সিকো থেকে একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে এসে আবার ফিরে গিয়ে।

অন্য দলগুলো যেখানে ম্যাচের আগের দিন স্টেডিয়ামে অনুশীলন ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে, সেখানে ইরান সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ম্যাচ শেষ করে দীর্ঘ বিমানযাত্রা শেষে করতে হয়েছে রিকভারি, যা পেশাদার ফুটবলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একদিকে ‘প্রতিপক্ষ’ দেশের মাটিতে খেলার মানসিক চাপ, অন্যদিকে বারবার যাতায়াতের শারীরিক ক্লান্তি—সব মিলিয়ে প্রতিকূলতার শেষ ছিল না। তারপরও ইরান অপরাজিত থেকেছে এবং ইতিহাস গড়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।

তাই এই বিশ্বকাপ ইরানের জন্য ব্যর্থতার গল্প নয়। বরং এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই, দৃঢ়তা ও আত্মমর্যাদার এক অনন্য উদাহরণ। নকআউটে উঠতে না পারলেও যুক্তরাষ্ট্রের মাটি ছেড়ে তারা ফিরছে অপরাজিত, আর সবচেয়ে বড় কথা—মাথা উঁচু করে।