রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় আজ (রোববার) ঘোষণা করা হবে। ঢাকা মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণা করবেন। মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের প্রত্যাশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।
রায় ঘোষণার আগে শিশুটির বাবা আবেগঘন কণ্ঠে বিচার ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। শনিবার রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি বলেন, “আমি একজন ধর্ষিতার বাবা কিংবা খণ্ডিত লাশের বাবা হিসেবে পরিচিত হতে চাইনি। আমি গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম।”
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, একটি ভবনের এক ফ্ল্যাটের দরজা থেকে আরেক ফ্ল্যাটের দরজার দূরত্ব মাত্র তিন ফুট। সেই সামান্য দূরত্বের মধ্যেও যদি একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে এর দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়, সমাজেরও। তিনি জানতে চান, এ দায় কার—পরিবারের, সমাজের নাকি রাষ্ট্রের?
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আজ আমাকে আর আমার নামে কেউ চেনে না। সবাই একজন ধর্ষিত শিশুর বাবা বা খণ্ডিত লাশের বাবা হিসেবেই চেনে। আমি শুধু আমার সন্তানের হত্যাকারীদের সুষ্ঠু বিচার চাই।”
তিনি সরকারের দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার প্রশংসা করে বলেন, মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ হওয়ায় তিনি আশাবাদী। একইসঙ্গে রায়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং তার দ্রুত কার্যকর হওয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন।
শিশুটির বাবা জানান, ঘটনার পর থেকে তার স্ত্রী গভীর মানসিক আঘাতের মধ্যে রয়েছেন। ১৩ দিন পেরিয়ে গেলেও তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। পাশাপাশি বড় মেয়ের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষ্য, এ ঘটনার প্রভাব শুধু তাদের পরিবারেই নয়, দেশের অসংখ্য শিশুর মনোজগতে ভয় ও অনিরাপত্তা তৈরি করেছে।
গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন পুতুল বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান বলেন, যৌন সহিংসতার ধরন বদলাচ্ছে এবং এর ভয়াবহতা বাড়ছে। অন্যদিকে বিএনপির নেত্রী নিপুণ রায় চৌধুরী বলেন, প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি এবং শিশুদের নিয়ে অশ্লীল কনটেন্ট তৈরির মতো অপরাধও বেড়েছে, ফলে শিশুরা ঘরের ভেতরেও পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
করপোরেট ব্যক্তিত্ব রুবাবা দৌলা অপরাধীদের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরির প্রস্তাব দেন। তার মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা ব্যবহার করে অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব।
উল্লেখ্য, গত ১৯ মে পল্লবীর একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর অভিযুক্ত সোহেল রানা বাসার শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে গেলেও পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকেই আটক করা হয় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে। পরে শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ হওয়ায় এটি দেশের বিচারিক ইতিহাসে দ্রুত নিষ্পত্তিকৃত আলোচিত মামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



