ঢাকার ফুটপাত দখল করে থাকা হকারদের পুনর্বাসনে ছয়টি খোলা মাঠে অস্থায়ী মার্কেট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। সংস্থাটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, নির্ধারিত এসব স্থানে নিবন্ধনের মাধ্যমে হকারদের বসানো হবে এবং নির্দিষ্ট ফি আদায়ের মাধ্যমে বাজারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে গুলশানের একটি হোটেলে ‘ঢাকা কি মৃত নগরী হতে যাচ্ছে? সমাধানে করণীয়’ শীর্ষক নগর সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান।
শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “ফুটপাতে আগে যেখানে ২০০ হকার ছিল, এখন তা বেড়ে প্রায় দুই হাজারে দাঁড়িয়েছে। এতে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। হাসপাতালের সামনে পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্স চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অল্পসংখ্যক মানুষের কারণে অধিকাংশ নাগরিক ভোগান্তিতে পড়ছেন। তাই হকারদের নির্দিষ্ট স্থানে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে।”
তিনি আরও জানান, দোকানগুলো ট্রলির আদলে তৈরি করতে হবে এবং কোনো স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী স্থাপনা করা যাবে না।
নগর ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, “আমাদের বেশিরভাগ উদ্যোগই সাময়িক। টেকসই সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি।” এ সময় ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোকে সমন্বিত একটি কর্তৃপক্ষের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও খাল রক্ষায় জনসম্পৃক্ততার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “মিরপুরের প্যারিস খাল গত দুই মাসে সাতবার পরিষ্কার করা হলেও আবার নোংরা হয়ে যায়। খালের পাড়ে বর্জ্য ফেললে জরিমানার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।”
সংলাপে গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত বলেন, “ঢাকা এখন গুরুতর সংকটে, যা একে ধীরে ধীরে ‘মৃত নগরী’র দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চারপাশের নদীগুলো দখল ও দূষণে কার্যত মৃত হওয়ায় শহরটি এখন মেঘনা নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল—যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।”
তিনি আরও বলেন, “বায়ুদূষণ সহনীয় মাত্রার তুলনায় ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি এবং শব্দদূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব হুমকি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত নগর শাসন, জবাবদিহিতা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অপরিহার্য।”
রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “নগর সেবাগুলো এক ছাতার নিচে আনতে পারলে সমন্বয়হীনতা কমবে। তথ্যের অভাবে অনেক সময় সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে।”
কড়াইল বস্তি প্রসঙ্গে তিনি জানান, “সেখানে বহুতল ভবন নয়, বিদ্যমান বস্তি কাঠামো বজায় রেখেই নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, কারণ বাসিন্দারা বহুতল ভবন চান না।”
তিনি আরও বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে অবৈধভাবে দখল করা পার্কিং স্পেস উদ্ধারে অভিযান চলছে এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দেওয়া হচ্ছে। পূর্বাচল প্রকল্পকে সক্রিয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর হাছিন আহমেদ জানান, প্রশাসনিক জটিলতায় বিভিন্ন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। “পাঁচ বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অনেক প্রকল্পে ১২ বছর লেগে যাচ্ছে। বর্তমানে মেঘনা, শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা থেকে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে, যা ৫১ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পৌঁছানো হয়; প্রয়োজন হলে তা ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ানো হবে,” বলেন তিনি।
স্থপতি সুজাউল ইসলাম খান বলেন, “শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না, বাস্তবায়ন জরুরি। রাজধানীর অধিকাংশ সুবিধা সীমিত কিছু এলাকার মধ্যেই কেন্দ্রীভূত, অথচ বস্তি এলাকায় তা পৌঁছায়নি।”
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম জানান, “গণপরিবহনের জন্য ২০ বছরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। ৪২টি বাস রুট কমিয়ে ৩২টিতে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি রুটে একটি কোম্পানির বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বছরের মধ্যেই নতুন ব্যবস্থায় বাস নামানো হবে।”
সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান, কীটতত্ত্ববিদ ড. ইন্দ্রাণী ধর এবং পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলমসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা।



