বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কেএম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে তার বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশাকে দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ ও প্রকাশের সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পাশাপাশি প্রেমের সম্পর্ক, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা অন্য কোনো ষড়যন্ত্রের বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালত দিশাকে আরও তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন। প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ড শেষে এদিন তাকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। তবে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের আগের দিন রাতে দিশার সঙ্গে উত্তরা নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট এবং সিপি ফাইভ স্টার রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে তারা একসঙ্গে সময় কাটান। হত্যাকাণ্ডে দিশা ও দীপের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
দিশা জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন উল্লেখ করে পিপি আরও বলেন, তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও ধারণ করে সাহসের সঙ্গে পাবলিশড করেন তাহসিফ। তিনি ভিডিও ধারণ না করলে মানুষ জানত না হাসিনা কীভাবে পালিয়ে গেছেন, রহস্য থেকে যেত। ভিডিও প্রকাশের জন্য তার বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না এবং প্রেমের কোনো বিষয়টা আছে কি না, সবকিছু নিয়ে তদন্ত চলছে।’
তদন্ত কর্মকর্তার রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম দফার চার দিনের রিমান্ডে দিশাকে বিভিন্ন কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় তিনি ঘটনার বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফের সঙ্গে উত্তরা নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন তিনি। ওই দিন সন্ধ্যায় একাধিকবার সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকসেও খাবার খান তারা। এ ছাড়া তাহসিফের সঙ্গে মোটরসাইকেলের গ্যারেজে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে বাইকে ঘোরাঘুরির বিষয়েও তথ্য দিয়েছেন দিশা।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, দিশার কাছ থেকে পাওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তদন্তের স্বার্থে গোপন রেখে যাচাই করা হচ্ছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি একাধিক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন এবং কিছু বিষয়ে নীরব থেকেছেন। এ কারণে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তাকে আরও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
মামলার আরেক সন্দেহভাজন আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ বর্তমানে পুলিশি রিমান্ডে রয়েছেন। দিশা ও দীপের দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে মিল-অমিল যাচাই করা জরুরি বলে রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণে দিশার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে এ ঘটনায় দিশার সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
দ্বিতীয় দফার রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা মূলত সাতটি বিষয় সামনে এনেছেন। এর মধ্যে রয়েছে, ঘটনার দিন উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রুআপ কমপ্লেক্সে অবস্থিত সিপি ফাইভ স্টার রেস্তোরাঁয় তাহসিফ ও দিশার মধ্যে কোনো আবেগপ্রবণ কথাবার্তা কিংবা বাক্বিতণ্ডা হয়েছিল কি না, তা জানা।
একই দিন নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে তাদের মধ্যে কোনো কথা-কাটাকাটি হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। ঘটনার দিন বা তার আগে তাদের সম্পর্কের মধ্যে কোনো টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল কি না, তা-ও জানতে চান তদন্তকারীরা।
এ ছাড়া মামলার মূল রহস্য উদঘাটন, অজ্ঞাতনামা অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলামত উদ্ধার এবং দিশা ও দীপের বক্তব্যের মধ্যে অসংগতি যাচাইয়ের জন্য পুনরায় রিমান্ড প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, দিশার পক্ষে আইনজীবী ইমাম হোসেন জাবেদ রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, তাহসিফ ও দিশা আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। ঘটনার দিন তারা একসঙ্গে রেস্তোরাঁয় যান এবং রাত ১২টার দিকে তাহসিফ দিশাকে বাসায় পৌঁছে দেন। তাদের মধ্যে কোনো বাক্বিতণ্ডা বা সম্পর্কের অবনতি হয়ে থাকলে তাহসিফ তাকে বাসায় পৌঁছে দিতেন না বলে যুক্তি দেন আইনজীবী।
তিনি আরও বলেন, মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেছেন, রাত ১টার দিকে তাহসিফকে ফোন করা হলে তিনি ৩০ মিনিটের মধ্যে বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন। দিশাকে শুধু ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে এবং রাত ১২টার পর থেকে তাহসিফের সঙ্গে তার আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। এসব যুক্তি তুলে ধরে দিশার জামিন চান তার আইনজীবী। তবে শুনানি শেষে আদালত তাকে আরও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন।
উল্লেখ্য, গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাত ২টার দিকে রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে দিশাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এর আগে ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরির ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। এর আগের দিন ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ‘দীপের ডাকে’ বাসার নিচে নেমে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এরপর তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।



