ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার দিকেই মনোযোগ দিতে বলছেন তার ঘনিষ্ঠ কিছু উপদেষ্টা। একই সঙ্গে তারা ব্যক্তিগত আলোচনায় প্রেসিডেন্টকে একটি সম্ভাব্য ‘এক্সিট র্যাম্প’ বা নিরাপদ প্রস্থানপথ খুঁজে বের করার পরামর্শও দিয়েছেন। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন—সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সোমবার (৯ মার্চ) ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের বেশিরভাগ লক্ষ্য ইতোমধ্যেই অর্জিত হয়েছে। তিনি দাবি করেন, নির্ধারিত সময়সূচির তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী অনেক দ্রুত অগ্রগতি করেছে।
ট্রাম্প বলেন, “আমরা নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এগিয়ে আছি। আমার বিশ্বাস, এই যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে।”
তবে ইরানে চলমান হামলা কখন আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হবে—এ বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দেননি। ইরানের জনগণের একটি অংশ বর্তমান শাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন বা বিদ্রোহ করছে, তাদের সহায়তা দেওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তিনি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে দ্রুত সংঘাতের সমাপ্তিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যা বহু বছরের শান্তির পথ খুলে দিতে পারে। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে এখনই বিষয়টি শেষ করে ফেলা ভালো।”
এদিকে ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্ব নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। ট্রাম্পের মতে, এই পদক্ষেপ ইঙ্গিত দেয় যে তেহরান সহজে পিছু হটতে রাজি নয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত জটিল। তাদের মতে, ইরান যদি আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর হামলা অব্যাহত রাখে এবং Israel যদি ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সংঘাত থেকে সহজে সরে আসা কঠিন হয়ে পড়বে।
এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান যদি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত করার চেষ্টা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। এই প্রণালীকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়।
প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সুবিধা স্পষ্ট থাকলেও প্রেসিডেন্ট সন্তোষজনক বিজয় ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ থামাতে চান না। ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের টানা যৌথ হামলার পরও তেহরান কেন আত্মসমর্পণ করছে না—এ নিয়ে ট্রাম্প মাঝে মাঝে বিস্ময়ও প্রকাশ করেছেন।
এদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “এই ধরনের অনেক প্রতিবেদন অজ্ঞাত সূত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়। আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, ওই তথাকথিত সূত্রগুলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠককক্ষে উপস্থিত থাকে না।”
তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্টের শীর্ষ উপদেষ্টারা সপ্তাহের সাত দিন, দিনে ২৪ ঘণ্টা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সফল করার জন্য কাজ করছেন। শেষ পর্যন্ত এই সামরিক অভিযান কখন শেষ হবে, সে সিদ্ধান্ত নেবেন সর্বাধিনায়ক নিজেই।
তবে যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে কিছু অসামঞ্জস্যও লক্ষ্য করা গেছে। গত সপ্তাহে তিনি বলেছিলেন, তিনি ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ চান এবং প্রয়োজনে স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। কিন্তু সোমবার তিনি মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক পোষ্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, স্থলবাহিনী পাঠানোর মতো কোনো নির্দেশ দেওয়ার কাছাকাছিও তিনি নেই।
তিনি একদিকে বলেছেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে, আবার অন্যদিকে সতর্ক করে বলেছেন, “আমরা আরও এগোতে পারি এবং প্রয়োজনে আমরা আরও এগোব।”
বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প প্রকাশ্য বক্তব্য এবং ব্যক্তিগত আলোচনায় ইঙ্গিত দিয়েছেন—যদি তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের দাবির কাছে নতি স্বীকার না করে, তাহলে তরুণ খামেনিকে লক্ষ্য করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও তিনি সমর্থন জানাতে পারেন।
এই সব বক্তব্য এমন সময় সামনে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত ওঠানামা করছে। সংঘাতের কারণে কিছু সময়ের জন্য তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি ছাড়িয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের কয়েকজন উপদেষ্টা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতেই পড়ে। বিশেষ করে সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্পের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা স্টিফেন মুর বলেন, “গ্যাস ও তেলের দাম বাড়লে প্রায় সব কিছুর দামই বেড়ে যায়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আগেই চাপের মধ্যে ছিল। এখন এটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।”
সূত্র:ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল



