বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য ১১ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যোগদানের পর তিনি ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং পরে এক সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গভর্নরের দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন।
মূল লক্ষ্য ও নীতি
- অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে অর্জিত সামষ্টিক স্থিতিশীলতাকে ভিত্তি করে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা।
- মুদ্রানীতি, বৈদেশিক লেনদেন, রিজার্ভ ও রাজস্ব সমন্বয়ের ভারসাম্য অটুট রাখা।
- জিডিপি বৃদ্ধির পাশাপাশি ইনক্লুসিভ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা; শিল্প, এসএমই, কৃষি ও সেবা খাতে সমান সুযোগ সৃষ্টি।
- বন্ধ বা কম কার্যকর শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পুনরায় সচল করতে ঋণ পুনঃতফসিল, সুদে ছাড় ও বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে নীতিগত সহায়তা প্রদান।
- সুদের হার পরিস্থিতি অনুযায়ী সমন্বয় করে ঋণপ্রবাহ ও মূল্যস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।
- মূল্যস্থিতি (প্রাইস স্ট্যাবিলিটি) বজায় রাখতে মুদ্রানীতি প্রয়োগ এবং খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির ওপর নিবিড় নজর রাখা।
- ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা; অনিয়ম, পক্ষপাত ও অস্বচ্ছতা রোধে কঠোর নজরদারি।
- সিদ্ধান্ত গ্রহণ তথ্য-উপাত্ত ও নীতিমালাভিত্তিক হবে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা প্রভাবনির্ভর নয়।
- ঋণ বিতরণ, পুনঃতফসিল, লাইসেন্সিং ও তদারকিতে সমান নীতি প্রয়োগ।
- সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কর্মকর্তাদের মধ্যে বণ্টন (ডেলিগেশন অব অথরিটি) করে কাজের গতি বৃদ্ধি।
- সরকারের অন্যান্য সংস্থা—অর্থ মন্ত্রণালয়, রাজস্ব বোর্ড ও পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার।
- আন্তর্জাতিক আস্থা বজায় রাখতে ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব পুনর্গঠন।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী প্রতিক্রিয়া
- অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করেছেন, প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া হয়নি।
- জাহিদ হোসেন (সাবেক বিশ্বব্যাংক, ঢাকা) বলেছেন, নতুন গভর্নরের নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত হলেও কিছুটা আনপ্রফেশনাল হয়েছে। বিদায়ী গভর্নরের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে আরও মসৃণ হতো।
- সেলিম রায়হান (সানেম) বলছেন, ব্যবসায়িক পটভূমির কারণে স্বার্থের সংঘাত ও অভিজ্ঞতার অভাব উদ্বেগের বিষয়। চলমান সংস্কার ও নীতির ধারাবাহিকতা অবারিত থাকতে পারে।
- বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসায়ী গভর্নরের নেতৃত্বে অর্থনীতির গতিধারা সঠিক পথে চলার আশা, তবে বিদায়ী গভর্নরের বিদায় সম্মানজনক হওয়া উচিত ছিল।
- টিআইবি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা, ঋণ পুনঃতফসিল ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন গভর্নর কতোটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের প্রোফাইল
- ভারত: ড. সঞ্জয় মালহোত্রা, সাবেক আইএএস ও অর্থ সচিব, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাবলিক পলিসিতে মাস্টার্স।
- শ্রীলঙ্কা: ড. নন্দলাল বীরাসিংহ, অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি, আইএমএফের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ।
- নেপাল: ড. বিশ্বনাথ পৌডেল, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি।
- ভুটান: দাশো ইয়াংচেন, অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাবলিক পলিসিতে মাস্টার্স।
- মালদ্বীপ: আহমেদ মুনাওয়ার, অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককোয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোনেটারি ইকোনমিক্সে মাস্টার্স।
- বাংলাদেশ: মোস্তাকুর রহমান, ব্যবসায়ী ও বিএনপির নির্বাচন কমিটির সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমকম (অ্যাকাউন্টিং), আইসিএমএবি থেকে সনদপ্রাপ্ত।



