জাতিসংঘকে কার্যত চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত বিকল্প সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’ শুরুতেই বিদ্রূপ, উপহাস ও কূটনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফাঁকে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যমে এই বোর্ডের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। তবে উদ্বোধনের পরপরই বোর্ডে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর তালিকা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন ও ভ্রমণ নীতির মধ্যে স্পষ্ট অসংগতি সামনে আসে।
উদ্বোধনী মঞ্চে ট্রাম্প যে ১৮টি দেশের প্রতিনিধিদের স্বাগত জানান এবং ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যা দেন, তাদের প্রায় অর্ধেকই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ট্রাভেল ব্যান’ বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। নিষেধাজ্ঞাভুক্ত দেশগুলো হলো—আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান ও উজবেকিস্তান।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসব দেশের নাগরিকদের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রেখেছে। ফলে কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—যে দেশগুলোর নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশই নিষিদ্ধ, তারা কীভাবে আমেরিকার নেতৃত্বে গঠিত একটি বৈশ্বিক ‘শান্তি সংস্থার’ মূল অংশীদার হতে পারে? ট্রাম্প একে ‘ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা’ হিসেবে অভিহিত করলেও বাস্তবে শুরুতেই এটি বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়েছে।
ট্রাম্প নিজেই এই বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও উজবেকিস্তানের প্রতিনিধিরা। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো প্রভাবশালী দেশের প্রতিনিধিকে এতে দেখা যায়নি। এমনকি গুঞ্জন রয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও এতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এই উচ্চাভিলাষী বোর্ডের সদস্য হতে প্রতিটি দেশকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার আর্থিক অবদান রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে, যা নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
বোর্ডের সদস্য হিসেবে ব্রিটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের নাম ঘোষণা করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমেরিকা সমৃদ্ধ হলে পুরো বিশ্বই সমৃদ্ধ হয়।’
এদিকে সম্মেলনে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ‘নিউ গাজা’ নামে একটি বিতর্কিত নকশা উন্মোচন করেন। সিজিআই প্রযুক্তিতে তৈরি ওই নকশায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজাকে একটি আধুনিক ‘রিভিয়েরা’ বা পর্যটন নগরীতে রূপান্তরের পরিকল্পনা দেখানো হয়। এতে অত্যাধুনিক ডেটা সেন্টার, হাইরাইজ বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, উপকূলীয় পর্যটনকেন্দ্র, এক লাখের বেশি আবাসন ইউনিট এবং ৭৫টি আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই বোর্ড গাজার পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একে ‘বোর্ড অব অ্যাকশন’ বা কর্মতৎপর সংস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, কুশনারের এই নকশা গত বছর প্রকাশিত একটি এআই-জেনারেটেড ভিডিওর প্রায় হুবহু অনুকরণ, যেখানে ট্রাম্প ও ইলন মাস্ককে গাজা উপকূলে ঘুরে বেড়াতে দেখা গিয়েছিল। ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটেই ‘বোর্ড অব পিস’-এর জন্ম বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, তাঁর এই ভিশন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘বোর্ড অব পিস’ মূলত জাতিসংঘের প্রভাব খর্ব করে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ। তবে নিজেরাই যেসব দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাদের নিয়ে গঠিত এই সংস্থার কার্যকারিতা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি ১ বিলিয়ন ডলারের ‘এন্ট্রি ফি’ একে কার্যত একটি ‘ধনকুবেরদের ক্লাব’ হিসেবেই চিহ্নিত করছে।
প্রথম নিউজ২৪/মহা



