tanaka

জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণে উন্নত দেশগুলোকে আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোকে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য তহবিল পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন...
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকদুই কারণে গ্রিনল্যান্ড পেতে চান ট্রাম্প

দুই কারণে গ্রিনল্যান্ড পেতে চান ট্রাম্প

প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক গঠনের কারণে গ্রিনল্যান্ডে সোনা, লোহা, তামা ও গ্রাফাইটসহ নানা মূল্যবান আকরিক ও খনিজের বড় ভাণ্ডার রয়েছে। তবে দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, কঠোর আবহাওয়া, পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি এবং খনিশিল্পের উচ্চ ব্যয়ের কারণে এসব সম্পদের বড় অংশ এখনো অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্যমতে, বর্তমানে সক্রিয় কোনো খনি না থাকা অঞ্চলগুলোর মধ্যে গ্রিনল্যান্ডেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজের সম্ভাব্য মজুত রয়েছে। বিরল মৃত্তিকা উপাদানের পাশাপাশি এখানে উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জার্মেনিয়াম ও গ্যালিয়ামের উল্লেখযোগ্য মজুতও আছে।

এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি এর পেছনে জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরেন। তাঁর এ বক্তব্যের পর খনিজসমৃদ্ধ দ্বীপটি নতুন করে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে আসে। গত সপ্তাহে মার্কিন গণমাধ্যম দ্য হিল-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বলেন, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের মূল কারণ জাতীয় নিরাপত্তা, পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ ও অন্যান্য কৌশলগত বিষয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রিনল্যান্ডে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজের সম্ভাবনা থাকলেও এর প্রকৃত পরিমাণ এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন কতটা লাভজনক হবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়। খনিজ অনুসন্ধান বিশেষজ্ঞ ও ডুরিন মাইনিং টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা টেড ফেল্ডম্যান বলেন, রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলায় গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়ানো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে শুধুমাত্র খনিজের কারণেই গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের টানব্রিজ ভাণ্ডারকে বিশ্বের অন্যতম বড় বিরল খনিজ ভাণ্ডার বলা হলেও সেখানে মূল্যবান ধাতুর ঘনত্ব তুলনামূলক কম, যা পরিবহণ ও উত্তোলনকে অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

ইউএসজিএস যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৬০টি খনিজ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে নিওডিমিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামের মতো বিরল মৃত্তিকা উপাদান আধুনিক প্রযুক্তির চুম্বক ও মোটর তৈরিতে অপরিহার্য। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিপ্লবের মূল চালিকা শক্তি সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ তৈরিতেও কয়েকটি বিরল খনিজের প্রয়োজন হয়।

বর্তমানে বিরল খনিজের প্রাপ্যতাকে বৈশ্বিক উচ্চপ্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি বড় ‘চোক পয়েন্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীন এই খাতে উত্তোলন ও পরিশোধনে আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় এ সুবিধাকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এ অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের উভয় দলের আইনপ্রণেতারা বিরল খনিজের জন্য ২৫০ কোটি ডলারের কৌশলগত মজুত গঠনের লক্ষ্যে একটি বিল উত্থাপন করেছেন।

জার্মেনিয়াম ফাইবার-অপটিক তার তৈরিতে এবং গ্যালিয়াম সেমিকন্ডাক্টর, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ডেটা সেন্টার ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বিশ্বে গ্যালিয়ামের প্রায় ৯৮ শতাংশ এবং জার্মেনিয়ামের প্রায় ৬০ শতাংশ সরবরাহ চীনের নিয়ন্ত্রণে। উত্তোলনের পর এসব খনিজ পরিশোধনেও বেইজিংয়ের আধিপত্য রয়েছে।

ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ইনস্টিটিউটের সহসভাপতি জ্যাক লিফটন বলেন, বিশ্বজুড়েই বিরল খনিজ রয়েছে, কিন্তু মূল সমস্যা হলো সেগুলো পরিশোধনের সক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রে এ খাতে দক্ষ জনবল ও অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে ১৪০টির বেশি সক্রিয় খনিজ লাইসেন্স থাকলেও বাস্তবে মাত্র দুটি খনি চালু আছে। এর একটি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আমারক লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী এলদুর ওলাফসন বলেন, সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ থাকলে গ্রিনল্যান্ডে খনিশিল্প সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। তবে এজন্য সড়ক, বন্দরসহ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যাপ্ত জনবল প্রয়োজন।

প্রতিকূল আবহাওয়া ও মাত্র ৬০ হাজার মানুষের বসবাস সত্ত্বেও গ্রিনল্যান্ডের খনি সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, আলাস্কা, কানাডা, নরওয়ে ও রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলে সফল খনির উদাহরণ রয়েছে।

সব মিলিয়ে, জাতীয় নিরাপত্তা ও বিরল খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করা—এই দুই কারণেই গ্রিনল্যান্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলগত আগ্রহের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।