রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাদের অর্থদণ্ড ও ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তিকে বিচার বিভাগের জন্য একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু।
রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, মামলার বিচারিক কার্যক্রম মূলত চার কার্যদিবসেই সম্পন্ন হয়েছে। পাঁচ কার্যদিবস হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে এত দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়া দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
তিনি জানান, রায়ের শুরুতেই আদালত উল্লেখ করেছেন যে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে আদালত বলেছেন, শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত এমন নৃশংস অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দয়া প্রদর্শনের সুযোগ নেই। সেই বিবেচনায় দুই আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
স্পেশাল পিপি আরও বলেন, রায়ের পর মামলাটি আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগে যাবে। এটি বিচার ব্যবস্থার স্বাভাবিক ধাপ। ‘ডিউ প্রসেস অব ল’ বা আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। একটি সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বিচার কাঠামো সেই নিয়ম মেনেই পরিচালিত হবে।
রায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্না খাতুনকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। এই অর্থ রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীদের প্রদান করা হবে।
আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছেন, নির্ধারিত অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হলে আসামিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে সেই অর্থ ভুক্তভোগীর পরিবারকে দিতে হবে।
রায়কে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও তৎপর থাকতে দেখা যায়।
এর আগে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে স্বপ্না খাতুনকে আদালতে আনা হয়। পরে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে প্রিজনভ্যানে করে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করা হয়। তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। রায় ঘোষণার আগে উভয় আসামিকে আদালতের এজলাসে তোলা হয়। বেলা ১১টার পর বিচারক রায় পাঠ শুরু করেন।
মামলাটির তদন্ত শেষে ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায়, গত ২৪ মে পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। একই দিন মামলাটি শিশু ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য পাঠানো হয়। তবে ঈদুল আজহার সরকারি ছুটি শুরু হওয়ায় ১ জুন চার্জ গঠনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন চার্জ গঠনের মাধ্যমে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ওই দিন সোহেল রানা ‘ডলার’ নামে এক ব্যক্তির ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেন। তবে তদন্তে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে আদালতকে জানান রাষ্ট্রপক্ষ ও তদন্ত কর্মকর্তা।
পরদিন ২ জুন মামলার ১৭ সাক্ষীর মধ্যে রামিসার বাবা-মা, বোন এবং স্বজনসহ ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি এবং ৪ জুন উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করেন।



