একসময় বাংলাদেশের গ্রামবাংলার বিকেল মানেই ছিল মাঠজুড়ে শিশু-কিশোরদের ছুটে চলা। ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা নানা স্থানীয় খেলায় মুখর থাকত পাড়া-মহল্লা। কিন্তু নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও উন্মুক্ত জায়গা কমে যাওয়ার কারণে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। খেলাধুলার সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু-কিশোররা। এই বাস্তবতা বদলে দেশজুড়ে ক্রীড়া অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
পরিকল্পনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে ইউনিয়ন পর্যায়ে খেলার মাঠ তৈরি। দেশের ৪ হাজার ৫৭৮টি ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটিতে অন্তত একটি উন্মুক্ত খেলার মাঠ তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে ৮ বিঘা জমি পাওয়া সম্ভব হবে, সেখানে ওই পরিমাণ জায়গায় মাঠ নির্মাণ করা হবে। আর পর্যাপ্ত জমি না পাওয়া গেলে অন্তত ৪ বিঘা জায়গা ব্যবহার করে মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কমিটি ইতোমধ্যে সম্ভাব্য মাঠের জায়গা চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশু-কিশোরদেরও নিয়মিত খেলাধুলার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি হবে।
তবে পরিকল্পনাটি শুধু ইউনিয়ন পর্যায়ের মাঠ তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের ১০টি জেলায় আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া কমপ্লেক্স বা স্পোর্টস ভিলেজ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রায় ৭ একর জায়গাজুড়ে এসব কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেখানে স্টেডিয়াম, ইনডোর এরিনা, সুইমিং, শুটিং, আর্চারি, জিমনেশিয়ামসহ বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার সুযোগ রাখার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে ঢাকাকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগকে জেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
উপজেলা পর্যায়েও ক্রীড়া অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ চলছে। শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১২৫টি উপজেলায় নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ২০১টি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য উপজেলাকেও এই অবকাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব মাঠ ও স্টেডিয়াম শুধু বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের স্থান হিসেবে ব্যবহার না করে স্থানীয় খেলোয়াড়দের নিয়মিত অনুশীলন, বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং প্রতিভা বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সম্ভাবনাময় তরুণ প্রতিভা খুঁজে বের করে তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে ক্রীড়া প্রতিভার অভাব নেই। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক প্রতিভাবান শিশু পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভালো কোচ, আধুনিক সরঞ্জাম কিংবা প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগের অভাবে হারিয়ে যায়। অনেকের প্রতিভা পরিবার বা স্থানীয় পর্যায়ের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর সুযোগও পায় না।
এই পরিস্থিতিতে ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা এবং জেলা থেকে বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত একটি সমন্বিত ক্রীড়া কাঠামো গড়ে উঠলে প্রতিভা খুঁজে বের করা এবং তাদের ধাপে ধাপে উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া সহজ হতে পারে। তবে শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। মাঠগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ কোচ, বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ, খেলোয়াড়দের পুষ্টি ও চিকিৎসা সহায়তা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
কারণ একটি খেলার মাঠ শুধু একটি খালি জায়গা নয়। একটি মাঠ শিশুকে শারীরিকভাবে সক্রিয় রাখে, দলগতভাবে কাজ করতে শেখায় এবং প্রতিযোগিতার মানসিকতা তৈরি করে। একই সঙ্গে কোনো কোনো শিশুর জন্য সেটিই হতে পারে বড় স্বপ্নের প্রথম ধাপ।
বাংলাদেশের অনেক ক্রীড়াবিদই স্থানীয় মাঠ থেকেই উঠে এসে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে উন্মুক্ত মাঠ কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের জন্য সেই সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। পরিকল্পনাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে সেই হারানো সুযোগ আবার ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
হয়তো দেশের কোনো প্রত্যন্ত ইউনিয়নের নতুন তৈরি হওয়া একটি মাঠেই একদিন প্রথমবার বল হাতে নেবে কোনো ভবিষ্যৎ ক্রিকেটার, দৌড় শুরু করবে কোনো সম্ভাবনাময় অ্যাথলেট কিংবা ধনুক হাতে দাঁড়াবে কোনো প্রতিভাবান আর্চার। সেই অর্থে মাঠ তৈরির এই উদ্যোগ শুধু ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নয়; সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিভা খুঁজে বের করার একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগও হতে পারে।



