‘বিশেষ মুহূর্তগুলো, যা আমি খুব মিস করতে যাচ্ছি…’—আর্জেন্টিনার পতাকার ইমোজির সঙ্গে সতীর্থদের পাশে দাঁড়িয়ে শেষ অনুশীলনের কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে এই আটটি শব্দই লিখলেন লিওনেল মেসি। ছোট্ট এই বার্তাতেই যেন লুকিয়ে থাকল দীর্ঘ এক আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আবেগ, স্মৃতি আর বিদায়ের বেদনা।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত পেরিয়ে ভোরে আফ্রিকার দেশ বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে শেষবারের মতো আন্তর্জাতিক ফুটবলে মাঠে নামার আগে এটাই ছিল মেসির শেষ বার্তা। রিভারপ্লেটের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের ম্যাচটির মধ্য দিয়েই ইতি ঘটতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের।
৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবল জাদুকর সোমবার শেষবারের মতো বুট পরে নেমেছিলেন এজেইজা প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডে। এই মাঠেই কেটেছে তাঁর জাতীয় দলের অসংখ্য অনুশীলন, প্রস্তুতি, আনন্দ-বেদনা। এখানেই সতীর্থদের সঙ্গে জয়ের উচ্ছ্বাস ভাগ করেছেন, আবার পরাজয়ের হতাশাও বয়ে বেড়িয়েছেন। বিশ্বকাপ জয়ের ঐতিহাসিক আনন্দও মিশে আছে এই মাঠের স্মৃতিতে।
অন্যান্য দিনের মতোই পায়ের কাছে বল নিয়ে সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলন শেষ করেন মেসি। কিন্তু দিনের শেষটা ছিল অন্য রকম। কারণ সবাই জানতেন—এই মাঠে আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে এটাই তাঁর শেষ অনুশীলন। বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচের পর আর কোনো জাতীয় দলের ক্যাম্পে দেখা যাবে না তাঁকে। থাকবে না দীর্ঘ ভ্রমণ, থাকবে না ম্যাচের আগে জাতীয় সংগীতের সেই আবেগঘন মুহূর্ত, থাকবে না আর্জেন্টিনার হয়ে আরেকটি লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতি।
মেসির শেষ অনুশীলন দেখতে সোমবার এজেইজার ট্রেনিং গ্রাউন্ডে হাজির হয়েছিলেন প্রায় একশ সাংবাদিক। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মূল মাঠে পা রাখেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। জিমে শারীরিক কসরত শেষ করে তাঁরা মাঠে এসে অনুশীলনে যোগ দেন।
মেসিও ছিলেন স্বাভাবিক ছন্দে। যেন অন্য সব দিনের মতোই। তাঁর পাশে ছিলেন দীর্ঘদিনের সতীর্থ রদ্রিগো ডি পল, নিকোলাস ওতামেন্দি ও জিওভানি লো সেলসো—যারা কেবল এই ম্যাচের জন্য দলে ডাক পেয়েছেন। ছিলেন ভবিষ্যৎ অধিনায়ক ক্রিস্তিয়ান ‘কুটি’ রোমেরো, হুলিয়ান আলভারেজ ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজও।
নিষেধাজ্ঞার কারণে অনুশীলনে ছিলেন না লেয়ান্দ্রো পারেদেস। তবে আগের দিন মেসির সম্মানে আয়োজিত বারবিকিউ পার্টিতে তিনি উপস্থিত ছিলেন।
শেষ অনুশীলনেও মেসির চিরচেনা হাসি-ঠাট্টার কমতি ছিল না। অনুশীলনের সবচেয়ে মজার মুহূর্তটি আসে ‘বল মাটিতে না ফেলার’ মহড়ায়। মেসির একটি কঠিন পাস নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হন ডি পল। সঙ্গে সঙ্গে সতীর্থদের মধ্যে শুরু হয়ে যায় হাসাহাসি। ডি পল মেসির দিকে আঙুল তুলে মজার ছলে ‘হুমকি’ দিলে মেসিও অন্যদিকে তাকানোর ভান করে হেসে ফেলেন।
এরপর ফিটনেস কোচ লুইস মার্তিনেজের নেতৃত্বে শুরু হয় নিয়মিত ওয়ার্ম-আপ সেশন। সবকিছুই চলছিল পেশাদার ফুটবলের চেনা নিয়মে। কিন্তু মাঠের চারপাশে উপস্থিত সবার কাছে পরিষ্কার ছিল—এটি আর দশটি অনুশীলনের মতো নয়। ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের জাতীয় দলের শেষ অনুশীলন এটি।
মাঠের এক পাশে তখন আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সভাপতি ক্লদিও ‘চিকি’ তাপিয়ার সঙ্গে ছিলেন তিন বিশেষ অতিথি। ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী মার্কোস আকুনিয়া, ২০১৪ বিশ্বকাপের সতীর্থ এজেকিয়েল লাভেজ্জি এবং ইন্টার মায়ামিতে মেসির বর্তমান কোচ ক্রিস্তিয়ান ‘কিলি’ গনজালেজ। তাঁরা কেউ খেলোয়াড় বা কোচ হিসেবে আসেননি। এসেছিলেন দীর্ঘদিনের বন্ধুকে ভালোবাসা জানাতে এবং তাঁর বিদায়ের মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে।
সূর্য যখন ধীরে ধীরে এজেইজার আকাশে হেলে পড়ছিল, তখন গোধূলির আলোয় শেষবারের মতো দেখা গেল সেই পরিচিত দৃশ্য—বল পায়ে মেসি। বাঁ পা তো বটেই, ডান পায়ের স্পর্শেও যেন ফুটে উঠছিল কয়েক দশকের ফুটবল-জাদুর শেষ অধ্যায়।
এরপর অপেক্ষা শুধু মনুমেন্টালের। বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন মেসি। যে জার্সি গায়ে তিনি শুরু করেছিলেন স্বপ্নের পথচলা, যে জার্সিতেই একসময় পেয়েছেন অসহনীয় হতাশা, আর শেষ পর্যন্ত জিতেছেন কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপের মতো অধরা শিরোপা—সেই জার্সিতেই এবার নামতে যাচ্ছেন বিদায়ী ম্যাচে।
মেসির বিদায় তাই কেবল একটি ম্যাচের সমাপ্তি নয়; এটি একটি যুগের পর্দা নামার মুহূর্ত।
তথ্যসূত্র: ওলে



