সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র, সহিংসতায় উসকানি, অবৈধ অর্থায়ন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তাঁরা হলেন লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরা (৪৩) ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দেবাশীষ (৪৭)।
সোমবার (১২ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলমের আদালত শুনানি শেষে তাঁদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের পরিদর্শক শেখ বশির আহমেদ আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
আদালতে রিমান্ড শুনানি
সোমবার বিকেল ৫টার দিকে দুই আসামিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। পরে তাঁদের আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে কড়া পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁদের এজলাসে নেওয়া হয়।
শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তা আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি দেন। আসামিপক্ষে আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মুনসুর রিপন রিমান্ড নামঞ্জুর ও জামিনের আবেদন করেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী হারুন অর রশিদ রিমান্ড মঞ্জুরের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত আসামিদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে প্রত্যেকের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে যেসব অভিযোগ
তদন্ত কর্মকর্তার রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, আসামিরা রাজধানীর পল্লবী থানাধীন একটি বাসায় অবস্থান করে ‘Bangladesh Awami League Supporters Alpha # 1’ ও ‘BBM Transparency’ নামের দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী ও সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি এবং প্রচার করছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আবেদনে আরও দাবি করা হয়, ‘Unity Care’ ও ‘Public Parliament’ নামের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তাঁরা সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগসাজশে আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। এ ছাড়া ‘কালআজকাল.কম’ নামের একটি ফেসবুক পেজ ব্যবহার করে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চালানোর অভিযোগও আনা হয়েছে।
রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ সালে আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে আসামিরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে ‘বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ’ গঠন করেন। পরে সংগঠনটির ১০১ সদস্যের একটি কমিটি তৈরি করা হয় বলেও আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া তদন্তে আসামিদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে।
যে পাঁচ কারণে রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ
তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ড আবেদনে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের পাঁচটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো—
1. মামলার অন্যান্য সহযোগী আসামির নাম-ঠিকানা ও অবস্থান শনাক্ত করা।
2. কথিত রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা।
3. ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল আলামত এবং অবৈধ অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধান করা।
4. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসামিদের পরিচালিত অন্য কোনো ওয়েবসাইট বা পেজ রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করা।
5. মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং অভিযোগে উল্লেখিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ঠেকানো।
যেভাবে গ্রেপ্তার হন দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা
এর আগে রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর পল্লবী ও বনানী থানাধীন ডিওএইচএস এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেন ডিবি পুলিশের পল্লবী জোনাল টিমের পরিদর্শক আলী আকবর।
মামলাটির তদন্তের অংশ হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল। আদালত শুনানি শেষে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তবে রিমান্ড আবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন; আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করার আইনি নীতি প্রযোজ্য।



