ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা, শোকযাত্রা ও দাফন উপলক্ষে ৩ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত সাত দিনের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় শোকসভা এবং শোকযাত্রার আয়োজন করা হবে। কর্মসূচির শেষ দিনে, ৯ জুলাই, ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, খামেনির দাফন মার্চ মাসেই হওয়ার কথা ছিল। তবে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা পিছিয়ে দেওয়া হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাতের প্রথম দিনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কম্পাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সী আলি খামেনি নিহত হন। ওই হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান।
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন আলি খামেনি। ইসলামি বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্রে তিনি দীর্ঘ সময় দেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এবারের রাষ্ট্রীয় জানাজা তার উত্তরসূরি ও ছেলে মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা হবে তার নেতৃত্বে প্রথম বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজন।
৩ জুলাই: তেহরানে আনুষ্ঠানিক সূচনা
সাত দিনের কর্মসূচির সূচনা হবে রাজধানী তেহরানে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও ইসলামি চিন্তাবিদরা এদিন আলি খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হবে।
৪ ও ৫ জুলাই: সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদন
৪ ও ৫ জুলাই তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে সাধারণ মানুষের জন্য শ্রদ্ধা নিবেদনের ব্যবস্থা রাখা হবে। সেখানে আলি খামেনির মরদেহের পাশাপাশি হামলায় নিহত তার পরিবারের সদস্যদের মরদেহও রাখা হবে, যাতে লাখো মানুষ শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে পারেন।
ইরানের অন্যতম বৃহৎ নামাজের স্থান গ্র্যান্ড মোসাল্লা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় ও ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
৬ ও ৭ জুলাই: তেহরান থেকে কোম
৬ ও ৭ জুলাই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মরদেহ নেওয়া হবে তেহরান থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত পবিত্র শহর কোমে।
শিয়া ইসলামের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্র কোমে ইরানের বৃহত্তম হাওজা বা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অবস্থিত। আলি খামেনিও জীবনের একটি সময় এই শহরে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।
৮ জুলাই: নাজাফ ও কারবালায় শোকযাত্রা
৮ জুলাই খামেনির মরদেহ ইরাকে নেওয়া হবে। প্রথমে নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা অনুষ্ঠিত হবে। পরে নাজাফ ও কারবালা শহরে জনসাধারণের অংশগ্রহণে বিশাল শোকযাত্রার আয়োজন করা হবে।
নাজাফে অবস্থিত হজরত ইমাম আলী (আ.)-এর মাজার শিয়া মুসলমানদের অন্যতম পবিত্র স্থান। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লি সেখানে জিয়ারত করতে যান। শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী, এখানেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচাতো ভাই, জামাতা এবং প্রথম ইমাম হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) সমাহিত রয়েছেন।
অন্যদিকে, কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.) ও হজরত আব্বাস (আ.)-এর মাজার শিয়া মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে কারবালার প্রান্তরে তাদের শাহাদাত শিয়া ইতিহাস ও ধর্মীয় পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
৯ জুলাই: মাশহাদে চূড়ান্ত দাফন
সাত দিনের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটবে ৯ জুলাই। এদিন আলি খামেনির মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে এনে মাশহাদের ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হবে।
মাশহাদ ইরানের সবচেয়ে পবিত্র শহরগুলোর একটি। শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমাম, হজরত ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজার এখানেই অবস্থিত।
এই শহরের সঙ্গে আলি খামেনির ব্যক্তিগত সম্পর্কও গভীর। ১৯৩৯ সালে মাশহাদেই তার জন্ম। শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় তিনি সেখানে কাটান এবং স্থানীয় ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। পরে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষার জন্য কোমে পাড়ি জমান।
বিশ্লেষকদের মতে, ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজারের পাশে খামেনিকে দাফন করা শুধু ধর্মীয় মর্যাদার প্রতীকই নয়, বরং ইরানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে তার দীর্ঘ নেতৃত্ব ও ধর্মীয় কর্তৃত্বেরও প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে।



