ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে ‘সর্বহারা পার্টির’ সদস্য পরিচয়ে কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের ছয় শিক্ষককে ফোন করে চাঁদা দাবি ও হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পৃথক মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার করে ধারাবাহিকভাবে এসব ফোন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা।
এ ঘটনায় কলেজের শিক্ষক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তা চেয়ে পাঁচ শিক্ষকের পক্ষে বোয়ালমারী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন কলেজের শিক্ষক পরেশ কুমার পাল।
যেভাবে চাঁদা দাবি করা হয়
জিডিতে পরেশ কুমার পাল উল্লেখ করেন, গত ৩ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টা ৫৭ মিনিটে কলেজে অবস্থান করার সময় তার মোবাইল ফোনে অপরিচিত একটি নম্বর থেকে কল আসে। ফোনদাতা নিজেকে ‘গৌতম বিশ্বাস’ নামে পরিচয় দেন এবং দাবি করেন, তিনি ‘সর্বহারা পার্টির’ বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য।
ফোনদাতা আরও দাবি করেন, তিনি ‘সিরাজ সিকদারের ছোট ভাই মহিউদ্দিন সিকদারের সঙ্গে কথা বলেন’। এরপর ওই ব্যক্তি পরেশ কুমার পালের কাছে চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
জিডির তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে এক লাখ টাকা চাওয়া হয়। পরে সর্বনিম্ন ২৫ হাজার ৫০০ টাকা ‘টোকেন মানি’ হিসেবে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
চাঁদার টাকা দ্রুত পাঠানোর জন্য ফোনদাতা বিভিন্ন ধরনের কথা বলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, ‘চা-পানের দোকানিরাও টোকেন মানি দিয়ে সহায়তা করে। আমাদের সহকর্মীদের জেল থেকে মুক্ত করতে টাকা প্রয়োজন।’
টাকা না দিলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলেও ফোনে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ওই শিক্ষক।
পরিবারসহ হত্যার হুমকির অভিযোগ
পরেশ কুমার পাল জানান, সম্প্রতি রংপুরে পরিবারসহ এক শিক্ষক হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তাকেও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের ফোন ও হুমকি কলেজের আরও কয়েকজন শিক্ষক পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
শিক্ষক নিলয় কুমার সাহা, সজল কান্তি বিশ্বাস, প্রদীপ কুমার সাহা ও দেবাশীষ রায়ের কাছেও ফোন করে চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দেবাশীষ রায় বলেন, তাকে ফোন করে টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ফোনদাতা তার ছেলের পায়ে গুলি লাগলে যেভাবে চিকিৎসার জন্য টাকা সংগ্রহ করবেন, সেভাবে পরিচিতজনদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে পাঠাতে বলেন।
একই সঙ্গে তাকে ‘চরমপন্থা নিতে বাধ্য করবেন না’ বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন দেবাশীষ রায়।
অন্যদিকে নিলয় কুমার সাহার ভাষ্য, ফোনদাতারা তাদের কথিত ‘সহকর্মীদের’ কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত করতে অর্থের প্রয়োজনের কথা বলে টাকা দাবি করেন। তাকেও পরিবারসহ প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকও চাঁদা দিয়েছেন
একই কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রবীন লস্করও একই ধরনের ফোন পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, দুই দিন আগে তাকে ফোন করে চাঁদা দাবি ও হুমকি দেওয়া হয়।
আতঙ্কের কারণে তিনি ফোনদাতাদের দেওয়া একটি বিকাশ নম্বরে পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন বলে জানান।
একই কলেজের শিক্ষকদের টার্গেট করায় উদ্বেগ
একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষককে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে চাঁদা দাবি ও হত্যার হুমকির ঘটনায় কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শিক্ষকদের প্রশ্ন, হুমকিদাতারা যে সংগঠনের পরিচয় দিচ্ছেন, সেটি সত্যিই কোনো চরমপন্থি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না। নাকি কোনো সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র সংগঠনের নাম ব্যবহার করে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে—তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষককে কেন লক্ষ্য করা হয়েছে, এর পেছনে কোনো পূর্বপরিকল্পনা বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
অভিযোগকারী শিক্ষক পরেশ কুমার পাল বলেন, ‘হুমকির কারণে আমরা ও আমাদের পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। যেকোনো সময় হামলা বা প্রাণনাশের ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা করছি।’
তিনি দ্রুত হুমকিদাতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অধ্যক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
ঘটনার বিষয়ে জানতে কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হোসনেয়ারা বেগমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
‘চরমপন্থি সংগঠনের নাম ব্যবহার করে প্রতারণা হতে পারে’
বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হুমকিদাতাদের শনাক্ত করতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা, চরমপন্থি কোনো সংগঠনের নাম ব্যবহার করে একটি প্রতারকচক্র এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ফোন নম্বর ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করা হচ্ছে জানিয়ে ওসি বলেন, তদন্তের মাধ্যমে হুমকিদাতাদের পরিচয় এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে।
এদিকে শিক্ষকরা দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে চাঁদা দাবি ও হত্যার হুমকির ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।



