tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের আগে রাষ্ট্রদূত দাউদ আলী ঢাকায় কেন?

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের আগে রাষ্ট্রদূত দাউদ আলী ঢাকায় কেন?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা। সফরের প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলীকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকদের অনেকে। কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি যৌথ বিবৃতির সংবেদনশীল অনুচ্ছেদ নিয়ে জাপানের আপত্তি এবং দুই দেশের মধ্যে চলমান গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি নিয়ে আলোচনার গোপনীয়তা—এ সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

সাধারণত কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে গেলে সংশ্লিষ্ট দেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সফরের প্রস্তুতি, কূটনৈতিক যোগাযোগ ও বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তবে তারেক রহমানের জাপান সফরের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। সফরের সময় টোকিওতে থাকছেন না বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত দাউদ আলী। শুধু তাই নয়, সফরসংক্রান্ত প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব থেকেও তাকে দূরে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ওয়াকিবহাল সূত্রের ভাষ্য, জাপানের জন্য স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে দেশটির আপত্তির বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সফরের আগে রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

চীন-বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতি নিয়ে জাপানের আপত্তি?

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ বিবৃতিতে অন্তর্ভুক্ত একটি অনুচ্ছেদকে কেন্দ্র করে জাপানের আপত্তি তৈরি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং ফ্যাসিবাদ ও সামরিকতাবাদের পুনরুত্থানের বিরোধিতা নিয়ে ওই অনুচ্ছেদের বক্তব্যকে টোকিও সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করে বলে সূত্রগুলোর দাবি।

জাপান দাউদ আলীকে চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেখে বলেও কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য, যৌথ বিবৃতির ওই অনুচ্ছেদ প্রণয়নে দাউদ আলীর ভূমিকা ছিল বলে মনে করে জাপান। এ নিয়ে সৃষ্ট অস্বস্তি থেকেই প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়ে থাকতে পারে।

একই সময়ে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। এসব আলোচনার গোপনীয়তা রক্ষার নিশ্চয়তা চায় টোকিও। রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় রাখার সিদ্ধান্তের পেছনে এটিও একটি কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

তবে চীন-বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতির অনুচ্ছেদ কিংবা চুক্তির গোপনীয়তা নিয়ে জাপানের অবস্থানের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সফরের ঠিক আগে সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন

প্রধানমন্ত্রীর সফরের ঠিক আগে রাষ্ট্রদূতকে দেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকদের অনেকে। তাদের প্রশ্ন, রাষ্ট্রদূতের ভূমিকা নিয়ে কোনো আপত্তি বা অসন্তোষ থাকলে তা আগে খতিয়ে দেখা হয়নি কেন? প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি যখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে, ঠিক তখনই কেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে হলো?

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৫ অক্টোবরের একটি চিঠিতে দাউদ আলীকে ঢাকায় ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালনের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়েছে।

আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ কর্মী পাঠানো এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সফরকে সামনে রেখে দুই দেশের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের প্রস্তুতিও চলছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের বক্তব্য অনুযায়ী, আটটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। এসব চুক্তি ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

এর আগেও দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল দাউদ আলীকে

দাউদ আলীকে দেশে ফিরিয়ে আনার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০০৯ সালে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। সে সময় তারেক রহমানকে লন্ডনে সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা পড়েছিল। পরে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে পররাষ্ট্র সার্ভিস একাডেমির ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

প্রায় ১৭ বছর পর আবারও প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের আগে দেশে ফিরতে হচ্ছে এই কূটনীতিককে। দুই ঘটনার প্রেক্ষাপট ও কারণ এক কি না, সে বিষয়ে অবশ্য কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

অবসরের সময়ও ঘনিয়ে এসেছে

দাউদ আলীর চাকরিজীবনের অবসরের সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। আগামী ৭ ডিসেম্বর থেকে তার অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) শুরু হওয়ার কথা।

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) ১৫তম ব্যাচের পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা দাউদ আলী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি রোমানিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (কনস্যুলার ও কল্যাণ) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কূটনৈতিক জীবনে টোকিও, প্রিটোরিয়া ও লন্ডনে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এ ছাড়া চীনের কুনমিংয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে কনসাল জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের আগে রাষ্ট্রদূতকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং সফরের সমন্বয়ের দায়িত্ব অন্য কর্মকর্তার হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে ওঠা বিভিন্ন দাবি ও ব্যাখ্যা কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।