শীত মৌসুম শুরুর আগে ইউরোপে গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস সংকটের আশঙ্কা না থাকলেও বিশ্ববাজারে চাহিদা ও দাম বাড়তে থাকলে শীতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে সরবরাহ ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
ইউরোপীয় কমিশনের জ্বালানিবিষয়ক কমিশনার ড্যান ইয়র্গেনসেন সদস্য দেশগুলোর সরকারকে চিঠি দিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদা কমানোর ব্যবস্থা চালু রাখা এবং প্রয়োজনে নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোনিউজের হাতে আসা ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ইউরোপের গ্যাস মজুতের পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
বর্তমানে ইউরোপের গ্যাস মজুতাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার প্রায় ৭০ শতাংশ গ্যাস রয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ হার প্রায় ১২ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংগ্রহে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপের প্রতিযোগিতা গ্যাসের বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
ইউরোপের অন্যতম প্রধান গ্যাস বাজার ডাচ টিটিএফে প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টা গ্যাসের দাম প্রায় ৭২ ইউরোতে উঠেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ ইউরো। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, শীতকালে চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টা গ্যাসের দাম ১০০ ইউরোর বেশি হতে পারে।
বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলএনজি সরবরাহ প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে কিংবা নরওয়ের গ্যাস রপ্তানিতে রক্ষণাবেক্ষণজনিত বাধা দীর্ঘায়িত হলে বাজারে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
ইয়র্গেনসেনের মতে, বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে ব্যবহার কমানো সম্ভব হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহারও কমবে। এতে একই সঙ্গে গ্যাসের সরবরাহ ও বিদ্যুতের দামের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।
২০২২ সালের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পরামর্শ
২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের সময় নেওয়া কয়েকটি পদক্ষেপ পুনরায় চালুর পরামর্শ দিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন। এর মধ্যে রয়েছে ব্যস্ত সময়ে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো, স্মার্ট মিটার ও বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে কম চাহিদার সময়ে ব্যবহার উৎসাহিত করা, সরকারি ভবনে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং রাতে অপ্রয়োজনীয় সড়কবাতি বন্ধ রাখা।
তবে এসব পদক্ষেপ বাধ্যতামূলক করার আহ্বান জানাননি ইয়র্গেনসেন। তাঁর মতে, স্বেচ্ছায় ও পরিকল্পিতভাবে জ্বালানির ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ ২০২২ সালের সংকটের সময় কার্যকর হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে সদস্য দেশগুলোর জাতীয় জরুরি পরিকল্পনা কার্যকর করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এসব পরিকল্পনার আওতায় প্রয়োজনে গ্যাস সরবরাহ কমানো বা বন্ধ করার চুক্তি ব্যবহার এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের পরিবর্তে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
গ্যাসের মজুত ৮০ শতাংশে রাখার পরামর্শ
শীতের আগে গ্যাসের মজুত বাড়াতে গিয়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি না করার বিষয়েও সতর্ক করেছে ইউরোপীয় কমিশন। সদস্য দেশগুলোকে দ্রুত ৯০ শতাংশ মজুতের লক্ষ্যে বিপুল পরিমাণ গ্যাস কেনার পরিবর্তে ৮০ শতাংশ মজুতের লক্ষ্য বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন ইয়র্গেনসেন।
সাধারণত শীতের বাড়তি চাহিদা মোকাবিলায় আগেভাগে গ্যাসের মজুত বাড়ানো হয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে সরবরাহ সীমিত থাকলে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ গ্যাস কেনার কারণে দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে গ্যাস কেনার সুযোগ রাখতে চায় ইউরোপীয় কমিশন।
ইয়র্গেনসেনের চিঠিতে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যাসের মজুত বর্তমানে স্বাভাবিকের তুলনায় কম হলেও সরবরাহ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কোনো ঝুঁকি নেই। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের আগের সময়ের তুলনায় ইউরোপের জ্বালানি ব্যবস্থা এখন সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বেশি সক্ষম। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়।
সূত্র: ইউরোনিউজ



