রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ও সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার নয় বছর পেরিয়ে গেলেও এই সংকটকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশ এই সংকট তৈরি করেনি, ফলে এর সমাধানের দায়িত্বও একা বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ‘প্রোট্র্যাক্টেড রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: দ্য সার্চ ফর এ কমপ্রিহেনসিভ অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে শুধু মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখলেই হবে না; এর রাজনৈতিক ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। মিয়ানমারকেই এই সংকটের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় এর প্রভাব এখন শুধু মানবিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়ও জড়িয়ে পড়েছে। তাই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেওয়া জরুরি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে গঠিত জাতীয় রোহিঙ্গা কৌশল প্রণয়ন কমিটি সরকারের কূটনৈতিক, মানবিক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় এনেছে। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগকে আরও কার্যকরভাবে সমন্বয় করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক বহুপক্ষীয় আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে ঢাকা।
চীনসহ আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় অংশীদারদের সহযোগিতায় মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও দৃঢ় ও বাস্তবভিত্তিক ভূমিকা প্রত্যাশা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ও দ্রুত পরিবর্তনশীল। সেখানে ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রয়োজন থাকলেও তাদের অবস্থান, স্বার্থ ও ভূমিকা এক নয়। ফলে মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ এগিয়ে নিতে হবে।
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে পুনর্বাসন বা একীভূতকরণ কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান নয় বলেও স্পষ্ট করেন পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় নিজ ভূমিতে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিই হওয়া উচিত সংকট সমাধানের মূল লক্ষ্য।
দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকটের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগি, নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন, আন্তর্জাতিক আদালতে ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের যৌথ আয়োজনে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে সহযোগিতা করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফরেন সার্ভিস একাডেমি ও ইউএনএইচসিআর।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, সম্মেলনে আলোচনার ভিত্তিতে যেসব সুপারিশ উঠে আসবে, সেগুলোর ভিত্তিতে সরকারের নীতিনির্ধারণে সহায়ক একটি ‘পলিসি ব্রিফ’ তৈরি করা হবে।



